ঢাকা ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি: লিথিয়ামের বিকল্প, নাকি শক্তির ভবিষ্যৎ ?

হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৩:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / 127

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি

বিশ্বজুড়ে যখন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই ব্যাটারি প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (Sodium-Ion Battery বা সংক্ষেপে SIB)।

 

এই উদীয়মান প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে গবেষক, নির্মাতা এবং বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে।

 

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি হলো এক ধরনের রিচার্জেবল ব্যাটারি, যেখানে প্রচলিত লিথিয়াম আয়নের পরিবর্তে সোডিয়াম আয়ন (Na⁺) শক্তি পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এর কার্যপ্রণালী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতোই, তবে এর কাঁচামাল এবং উৎপাদন খরচে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। সোডিয়াম পৃথিবীর চতুর্থ সহজলভ্য মৌলিক উপাদান, যা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি এবং খনিজ লবণে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এই সহজলভ্যতা এবং কম দামের কারণে SIBs লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির একটি কার্যকর এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

 

 

যে সুবিধাগুলো বাজারকে বদলে দিতে পারে:

* খরচে সাশ্রয়ী: লিথিয়ামের তুলনায় সোডিয়াম অনেক সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি ব্যাটারি চালিত পণ্যগুলোকে আরও সাশ্রয়ী করে তুলবে।

* কাঁচামাল সহজলভ্যতা: পৃথিবীর বিশাল প্রাকৃতিক উৎস, বিশেষ করে সমুদ্রের পানি ও খনিজ লবণ, থেকে সোডিয়াম সহজে নিষ্কাশণ করা যায়। এর ফলে লিথিয়ামের মতো ভৌগোলিক বা ভূ-রাজনৈতিক কাঁচামাল সংকটের ঝুঁকি অনেক কম।

* উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলতা: SIBs উচ্চ তাপমাত্রায় তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করে এবং এর স্থায়িত্বও বেশি। এটি উষ্ণ জলবায়ুর দেশ, যেমন বাংলাদেশের মতো অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর।

* পরিবেশবান্ধব: সোডিয়াম বিষাক্ত নয় এবং এটি রিসাইক্লিং করাও তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে, এটি পরিবেশের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং টেকসই সমাধান।

* নিরাপত্তা: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে বেশি নিরাপদ, কারণ এটি অতিরিক্ত গরম হওয়া বা আগুন লাগার ঝুঁকি কমায়।

 

 

বিশ্বজুড়ে অগ্রগতি ও উদ্ভাবন:

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে জোর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ চলছে:

* চীন: বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি নির্মাতা CATL (Contemporary Amperex Technology Co. Limited) ইতোমধ্যেই তাদের প্রথম প্রজন্মের সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে SIBs-কে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। BYD-এর মতো অন্যান্য চীনা কোম্পানিও এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।

* ভারত: Reliance Industries ইউরোপীয় কোম্পানি Faradion-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে সোডিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনে কাজ করছে। ভারত সরকারও SIBs গবেষণায় প্রচুর বিনিয়োগ করছে, কারণ তারা লিথিয়াম আমদানির উপর নির্ভরতা কমাতে চায়।

* ইউরোপ ও আমেরিকা: একাধিক স্টার্টআপ, যেমন Natron Energy (USA), Tiamat (France), এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সোডিয়াম ব্যাটারি নিয়ে গভীর গবেষণায় নিযুক্ত। তারা নতুন ক্যাথোড ও অ্যানোড ম্যাটেরিয়াল এবং ইলেক্ট্রোলাইট ফর্মুলেশন নিয়ে কাজ করছে যাতে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা এবং আয়ুষ্কাল বাড়ানো যায়।

 

 

কোথায় ব্যবহারের সম্ভাবনা?

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কম খরচ এবং নিরাপত্তা এটিকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে:

* ইলেকট্রিক যানবাহনে (EV): স্বল্প পাল্লার ইভি এবং দ্বিচক্রযানের (two-wheelers) জন্য SIBs একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে। এটি ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমাতে সাহায্য করবে।

* সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সঞ্চয়ে (Grid Storage): নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখতে SIBs অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর কম খরচ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলতা এটিকে বড় আকারের গ্রিড স্টোরেজের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।

* স্মার্ট গ্রিড সিস্টেমে এবং অফগ্রিড বিদ্যুৎব্যবস্থায়: আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা এবং যেসব এলাকায় জাতীয় গ্রিডের সংযোগ নেই, সেখানে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।

* বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে: যেখানে সৌরশক্তি ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি ক্ষেত্রে সেচ পাম্প চালানো বা ছোট আকারের শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি আদর্শ।

* বাসা-বাড়ির ব্যাকআপ সিস্টেম: বিদ্যুতের লোডশেডিং মোকাবিলায় SIBs বাসা-বাড়ির জন্য একটি সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ সমাধান হতে পারে।

 

 

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেও?

বাংলাদেশে সৌরশক্তির ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সোলার হোম সিস্টেম (SHS) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সহজলভ্য হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। সরকার এবং বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে যথাযথ পরিকল্পনা, গবেষণা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে দেশের বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি খাতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। দেশীয় কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদনে এগিয়ে এলে তা শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করবে।

যদিও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এখনো পরিপূর্ণভাবে বাজারে আসেনি, তবে এর সম্ভাব্যতা অনস্বীকার্য। এটি যে ভবিষ্যতের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হতে যাচ্ছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে SIBs একটি টেকসই, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন শুধু শক্তির জগতেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি এবং পরিবহন সব খাতেই এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

লেখক: হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক।

 

আরো পড়তে পারেন

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং প্রতিরোধের উপায়

 

 

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি: লিথিয়ামের বিকল্প, নাকি শক্তির ভবিষ্যৎ ?

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৩:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বিশ্বজুড়ে যখন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই ব্যাটারি প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (Sodium-Ion Battery বা সংক্ষেপে SIB)।

 

এই উদীয়মান প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে গবেষক, নির্মাতা এবং বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে।

 

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি হলো এক ধরনের রিচার্জেবল ব্যাটারি, যেখানে প্রচলিত লিথিয়াম আয়নের পরিবর্তে সোডিয়াম আয়ন (Na⁺) শক্তি পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এর কার্যপ্রণালী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতোই, তবে এর কাঁচামাল এবং উৎপাদন খরচে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। সোডিয়াম পৃথিবীর চতুর্থ সহজলভ্য মৌলিক উপাদান, যা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি এবং খনিজ লবণে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এই সহজলভ্যতা এবং কম দামের কারণে SIBs লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির একটি কার্যকর এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

 

 

যে সুবিধাগুলো বাজারকে বদলে দিতে পারে:

* খরচে সাশ্রয়ী: লিথিয়ামের তুলনায় সোডিয়াম অনেক সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি ব্যাটারি চালিত পণ্যগুলোকে আরও সাশ্রয়ী করে তুলবে।

* কাঁচামাল সহজলভ্যতা: পৃথিবীর বিশাল প্রাকৃতিক উৎস, বিশেষ করে সমুদ্রের পানি ও খনিজ লবণ, থেকে সোডিয়াম সহজে নিষ্কাশণ করা যায়। এর ফলে লিথিয়ামের মতো ভৌগোলিক বা ভূ-রাজনৈতিক কাঁচামাল সংকটের ঝুঁকি অনেক কম।

* উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলতা: SIBs উচ্চ তাপমাত্রায় তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করে এবং এর স্থায়িত্বও বেশি। এটি উষ্ণ জলবায়ুর দেশ, যেমন বাংলাদেশের মতো অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর।

* পরিবেশবান্ধব: সোডিয়াম বিষাক্ত নয় এবং এটি রিসাইক্লিং করাও তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে, এটি পরিবেশের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং টেকসই সমাধান।

* নিরাপত্তা: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে বেশি নিরাপদ, কারণ এটি অতিরিক্ত গরম হওয়া বা আগুন লাগার ঝুঁকি কমায়।

 

 

বিশ্বজুড়ে অগ্রগতি ও উদ্ভাবন:

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে জোর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ চলছে:

* চীন: বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি নির্মাতা CATL (Contemporary Amperex Technology Co. Limited) ইতোমধ্যেই তাদের প্রথম প্রজন্মের সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে SIBs-কে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। BYD-এর মতো অন্যান্য চীনা কোম্পানিও এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।

* ভারত: Reliance Industries ইউরোপীয় কোম্পানি Faradion-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে সোডিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনে কাজ করছে। ভারত সরকারও SIBs গবেষণায় প্রচুর বিনিয়োগ করছে, কারণ তারা লিথিয়াম আমদানির উপর নির্ভরতা কমাতে চায়।

* ইউরোপ ও আমেরিকা: একাধিক স্টার্টআপ, যেমন Natron Energy (USA), Tiamat (France), এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সোডিয়াম ব্যাটারি নিয়ে গভীর গবেষণায় নিযুক্ত। তারা নতুন ক্যাথোড ও অ্যানোড ম্যাটেরিয়াল এবং ইলেক্ট্রোলাইট ফর্মুলেশন নিয়ে কাজ করছে যাতে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা এবং আয়ুষ্কাল বাড়ানো যায়।

 

 

কোথায় ব্যবহারের সম্ভাবনা?

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কম খরচ এবং নিরাপত্তা এটিকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে:

* ইলেকট্রিক যানবাহনে (EV): স্বল্প পাল্লার ইভি এবং দ্বিচক্রযানের (two-wheelers) জন্য SIBs একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে। এটি ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমাতে সাহায্য করবে।

* সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সঞ্চয়ে (Grid Storage): নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখতে SIBs অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর কম খরচ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলতা এটিকে বড় আকারের গ্রিড স্টোরেজের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।

* স্মার্ট গ্রিড সিস্টেমে এবং অফগ্রিড বিদ্যুৎব্যবস্থায়: আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা এবং যেসব এলাকায় জাতীয় গ্রিডের সংযোগ নেই, সেখানে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।

* বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে: যেখানে সৌরশক্তি ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি ক্ষেত্রে সেচ পাম্প চালানো বা ছোট আকারের শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি আদর্শ।

* বাসা-বাড়ির ব্যাকআপ সিস্টেম: বিদ্যুতের লোডশেডিং মোকাবিলায় SIBs বাসা-বাড়ির জন্য একটি সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ সমাধান হতে পারে।

 

 

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেও?

বাংলাদেশে সৌরশক্তির ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সোলার হোম সিস্টেম (SHS) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সহজলভ্য হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। সরকার এবং বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে যথাযথ পরিকল্পনা, গবেষণা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে দেশের বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি খাতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। দেশীয় কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদনে এগিয়ে এলে তা শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করবে।

যদিও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এখনো পরিপূর্ণভাবে বাজারে আসেনি, তবে এর সম্ভাব্যতা অনস্বীকার্য। এটি যে ভবিষ্যতের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হতে যাচ্ছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে SIBs একটি টেকসই, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন শুধু শক্তির জগতেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি এবং পরিবহন সব খাতেই এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

লেখক: হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক।

 

আরো পড়তে পারেন

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং প্রতিরোধের উপায়