ভাইয়ের চোখ উপড়ে দিল বাবার নির্দেশে
- সর্বশেষ আপডেট ১২:০২:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / 83
অমানবিকতার এমন ভয়াবহ চিত্র সত্যিই বিরল। এক ভাই বুকের ওপর চেপে বসে অন্য ভাইয়ের চোখ খুঁচিয়ে উপড়ে বাবার হাতে তুলে দেন। আরেক ভাই বসে আছেন বুকের ওপরই, যাতে তিনি নড়তে না পারেন। এক ভাইয়ের স্ত্রী এবং তাঁর মেয়ে চেপে ধরেছেন হাত, জুতার বাড়ি পড়ছে মাথা ও শরীরে।
প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করছেন বোন, কিন্তু তাঁকেও আটকে রেখেছে কেউ।
এমন বিভীষিকাময় দৃশ্য ধরা পড়েছে এক ভিডিওতে, যা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনাস্থল বরিশালের মুলাদী উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের সাহেবের চর গ্রাম। গত শুক্রবার গভীর রাতে শুধু টাকার লোভেই বাবার নির্দেশে দুই ভাই মিলে আরেক ভাইয়ের দুই চোখ উৎপাটন করেন।
চোখ হারানো ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম ওরফে রিপন বেপারী (৫০)। তিনি ওই গ্রামের আরশেদ বেপারীর সেজো ছেলে। আরশেদ বেপারীর অন্য দুই ছেলে মেজো রোকন বেপারী ও ছোট স্বপন বেপারী এই নৃশংস ঘটনা ঘটান।
এ ঘটনার পর রবিবার রিপনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে আদালতে নালিশি আবেদন করেন।
আদালত এজাহারটি মামলা হিসেবে রুজু করে মুলাদী থানার ওসিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। রিপনের দুই ভাই রোকন বেপারী ও স্বপন বেপারী এবং রোকন বেপারীর স্ত্রী নুর নাহার বেগম, মেয়ে সুবর্ণা আক্তারকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। মামলার আসামির তালিকা থেকে বাদ পড়েন রিপনের বাবা আরশেদ বেপারী। আরও তিন প্রতিবেশীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ বলছে, রিপন বহু বছর ঢাকায় থাকতেন।
নানা অপকর্ম করে তিনি যে টাকা ও স্বর্ণ সংগ্রহ করেছিলেন, তা মেজো ভাই রোকনের কাছে গচ্ছিত রাখতেন। সম্প্রতি ঢাকার একটি মামলায় রিপন জেলহাজতে ছিলেন। তখন রোকন তাঁর কোনো খোঁজ রাখেননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মনির হোসেন শিকদার বলেন, কয়েক দিন আগে রিপন গ্রামের বাড়িতে আসেন। ভাইয়ের কাছে রাখা টাকা ও স্বর্ণালংকার ফেরত চাইতেই শুরু হয় ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব। একাধিকবার সালিস বৈঠক হলেও মেলেনি সমাধান। শেষবারের মতো শনিবার আবার সালিস বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
রিপনের বড় ভাই খোকন বেপারী জানান, শুক্রবার রিপন ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন। রাত ১১টার দিকে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে রাত আড়াইটার দিকে বাবা আরশেদ বেপারী ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলেদের নির্দেশ দেন রিপনের চোখ তুলে নিতে। ‘বাবার মুখের সেই নির্দেশই আমাদের ভাইয়ের জীবনের আলো নিভিয়ে দিল,’ বলেন তিনি।
খোকন আরও জানান, ঘটনার সময় তিনি নিজের বাড়িতে ছিলেন। খবর শুনে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সব কিছু শেষ হয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় রিপনকে উদ্ধার করে প্রথমে গৌরনদীর আশুকাঠি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য রিপনকে মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁও চক্ষু ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে। সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আরশেদ বেপারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাতে ঝগড়ার সময় প্রতিবেশী নবীন, ইসমাইল খলিফা ও তাঁর ভাই সেকেন খলিফা বাসার সামনে এসেছিল। কারা কী করেছে, আমি দেখিনি। ঘটনার পর আমি রিপনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করি। তবে তার সঙ্গে তখন চোখ ছিল না। কোথায় আছে, তা-ও আমি জানি না।’
প্রতিবেশী এনামুল হক ভেজা চোখ ও ধরা গলায় বলেন, ‘টাকার জন্য ভাই ভাইকে এভাবে শেষ করে দেয়, তা আগে কখনো দেখিনি। আর সেই নির্দেশ দিলেন বাবা!’
রিপনের ছেলে শাহেদুল ইসলাম শাহিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘চাচাদের কাছে গচ্ছিত ৩৫ লাখ টাকা আর ২০ ভরি স্বর্ণ ফেরত চাইতেই বাবার চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। আমরা এখন অন্ধকারে। বাবার চোখ নেই, আমাদের ভবিষ্যৎও নেই। দুটি চোখ খুঁচিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে এমন ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে যে নতুন করে চোখ স্থাপনও সম্ভব নয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।’
মুলাদী থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, রিপন বেপারী ঢাকায় থাকেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার রমনা থানায় চুরি ও ছিনতাইয়ের আটটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া মুলাদী থানায় হত্যা মামলাসহ তাঁর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২০টি মামলা রয়েছে। রিপনের চোখ উৎপাটনের ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে। সে আদেশ এখনো থানায় এসে পৌঁছায়নি।


































