শ্রীলঙ্কার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩৯:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫
- / 257
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শিল্পকারখানার বিপুল রাষ্ট্রীয়করণ ঘটে। সেটা স্বাভাবিক ছিল। অধিকাংশ শিল্পকারখানার মালিকানাই ছিল অবাঙালিদের। তারা দ্রুতগতিতে প্রস্থান করায় পরিত্যক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনা হবে– এটা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। ওদিকে সমাজতন্ত্রের আওয়াজও উঠেছিল, নানা দিক থেকে। তাই অবাঙালিদের সঙ্গে বাঙালি মালিকদের শিল্পকারখানাও রাষ্ট্রীয়করণ করাকে তখন মোটেই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু তার পরপরই শুরু হয়ে গেছে বিরাষ্ট্রীয়করণের তৎপরতা এবং পড়ে যায় ব্যক্তিমালিকানায় ফেরত আনার হিড়িক। বাংলাদেশের গত ৫৪ বছরের ইতিহাস ব্যক্তিমালিকানায়নেরই নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস।
কৃষি তো আগেই ব্যক্তিমালিকানাধীন ছিল। শিক্ষারও প্রায় পুরোটা এগিয়েছে ব্যক্তিমালিকানার (নামান্তরে ব্যবসা) ক্রমসম্প্রসারণ সড়ক ধরে। স্বাস্থ্যের দশাটা আরও করুণ। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাব, ওষুধ পাওয়া যায় না, ডাক্তার আসেন না, নার্সরা অনিয়মিত এবং সরকারি হাসপাতালেই আকারে ইঙ্গিতে এমনকি সবাক্যেও পরামর্শ পাওয়া যায় প্রাইভেট হাসপাতালে যাবার।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ২০১৯ সালের এক হিসাব বলছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ চলে যায় ব্যক্তির পকেটে। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তি খাতের স্ফীতির ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কাছে অন্যরা হার মেনেছে, এমনকি পাকিস্তানও; সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সেবাদানকারীরা পায় মোট খরচের ৫৪ শতাংশ।
গত ১৩ মে সমকালে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অন্যতম জেলা বরগুনার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সিং সার্ভিস ও অন্যান্য ২৩৩টি পদ মঞ্জুর করা হয়। অথচ বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১২৩ জন। চিকিৎসকের ৫৫ পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১৬ জন। ১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে ৯টিই খালি। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের বিপরীতে খালি আছে সার্জারি, চক্ষু, কার্ডিওলজি, অর্থো সার্জারি, প্যাথলজি, রেডিওলজিসহ সাতটি পদ। মেডিকেল অফিসার ও সমমানের ২৯ পদের বিপরীতে আছেন সাতজন। এই হাসপাতালে দিনে ভর্তি থাকে ৪০০-৫০০ রোগী। অথচ বরাদ্দ আসে সেই ১০০ শয্যার। ১০০ রোগীর জন্য দিনপ্রতি বরাদ্দ মেলে মাত্র ১৭৫ টাকা। অথচ ২৫০ শয্যার হিসাবে বছরে রোগীর খাবারে খরচ হয় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা। বাড়তি ৯৫ লাখ টাকা হাসপাতালের অন্যান্য খাত থেকে খরচ করতে হয় বলে কর্মকর্তাদের ভাষ্য। যে কারণে ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রীসহ অন্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় টাকা মেলে না।
বরগুনার এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য দপ্তর কেন বলছে অবৈধ ও অদক্ষ ক্লিনিক ও হাসপাতালে সারাদেশ একেবারে ছেয়ে গেছে। এটি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ। বৈধ হাসপাতালের সংখ্যা ও সেবা কার্যকর ও পর্যাপ্ত হলে অবৈধরা অমনভাবে মাথাচাড়া দিতে পারত না।
জিনিসপত্রের দাম বহুদিন যাবৎ আকাশছোঁয়া। শুক্রবারই সমকাল লিখেছে, ডিম ও সবজির দামে অস্বস্তি। সয়াবিন তেলের দাম অনেক আগেই সাধারণের নাগালের বাইরে; মানুষের প্রাথমিক চাহিদা চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। ধনী ব্যবসায়ীরা ধান কিনে মজুত করে রাখছে। কৃষক ধান ধরে রাখতে পারছে না। তাকে কর্জ মেটাতে হয়। সঙ্গে আছে সংসার খরচ। মৌসুমের শুরুতে সস্তায় ধান বিক্রি করে সেই ধানের চালই তাকে বেশি দামে কিনতে হয়। বড় বড় কোম্পানি, আগে যারা অন্য ব্যবসা করত, শিল্পকারখানাও যাদের ছিল, সুযোগ বুঝে ইদানীং তারা মজুতদারি, আড়তদারিতে নেমেছে। দেশে খাদ্যশস্যের নাকি ঘাটতি নেই। কিন্তু ভরা মৌসুমেই চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ভারতের কৃষকরা এই রকম বড় ব্যবসায়ী তৎপরতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে; সরকারি জুলুমের মুখে তারা অটল থেকেছে এবং কৃষিপণ্যের বাজারে বড় ব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপ প্রতিহতকরণে শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছে। সন্দেহ কি, বাংলাদেশেও ওই রকমের আন্দোলন আজ অত্যাবশ্যক। কিন্তু কে করবে সেই কাজ? কৃষক সমিতি ছিল; এখন আছে কিনা বোঝা যায় না। ক্ষেতমজুর আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, এখন সেটি নিশ্চিহ্নপ্রায়। খাঁ খাঁ করছে মাঠ।
অনুন্নত ঢাকা শহরে পার্ক, খোলা জায়গা আগে ছিটেফোঁটা কিছু ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ধারাবাহিকভাবে সেগুলো উধাও হয়ে গেছে। গিলে খেয়ে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা। সম্প্রতি সমকাল এ নিয়েও প্রতিবেদন ছেপেছে, যেখানে বলা হয়েছে ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় চলে গেছে ঢাকার প্রায় সব মাঠ ও পার্ক। ধানমন্ডি এলাকায় কয়েকটি খেলার মাঠ ছিল, সেগুলো এখন আর পাবলিকের নেই। ক্লাব নামের প্রতিষ্ঠান লিজ নিয়ে প্রাইভেট করে ফেলেছে। এক চিলতে খোলা জায়গা কলাবাগানের, তেঁতুলতলা নাম, সেটা চলে যাচ্ছিল পুলিশের মালিকানাধীন। স্থানীয় মানুষেরা কোনোমতে ঠেকিয়েছে; আবারও তা নাকি বেহাত হচ্ছে।
উন্নতির একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য মডেল স্থাপিত হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। এ দ্বীপরাষ্ট্রকে মনে হচ্ছিল শান্তির দ্বীপ। উন্নতির প্রমাণ সর্বত্র জাজ্বল্যমান। মানুষ শতভাগ শিক্ষিত। ট্যুরিস্টরা আসে দলে দলে। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ছিল ভরপুর। সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের বড় বড় প্রজেক্টের কাজ চলছিল জোরেশোরে। সরকার বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে এবং নিয়েছে উদারহস্তে। কিন্তু উন্নতির ওই মডেল যে কতটা অন্তঃসারশূন্য, প্রতারক ও বিপজ্জনক, তা ধরা পড়ে গেছে উন্নয়নেরই অপর এক অনুষঙ্গ করোনাভাইরাসের আঘাতে। দেশটি দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রতিকার চেয়ে দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। তারা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইল, যারা একই মাতা-পিতার সন্তান, আপন ভাই। মন্ত্রিসভার ৩০ সদস্যের মধ্যে সাতজনই নাকি ওই পরিবারের লোক। রাজাপাকসে পরিবারের। রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড।
শেষ পর্যন্ত রাজাপাকসের পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটেছে; কিন্তু তারপর? কারা আসবে ক্ষমতায়? না, সেটা কেউ জানত না। কেননা, দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক বিকল্পের অস্তিত্ব ছিল না। বিকল্প গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। বিকল্প গড়বার সকল প্রচেষ্টাকে নির্বংশ করা হয়েছিল। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় যারা নেমে এসেছে, তারা জানে না বিকল্প কী। অথচ বিকল্প তো দরকার। আর বিকল্প সেজে ভিন্ন নামে অন্য কোনো রাজাপাকসের শাসন চালু হলে তো চলবে না; হতে হবে একেবারে ভিন্ন রকমের শাসন। অর্থাৎ কিনা পুঁজিবাদী নয়, সমাজতন্ত্রী শাসন। নির্বাচনে কিন্তু বামপন্থিদের সঙ্গে সচেতন নাগরিকদের কোয়ালিশনই জয়ী হলো। ইতোমধ্যে সেই বামপন্থি সরকার শ্রীলঙ্কার দুরবস্থা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দেশটিকে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশের জন্য তো অবশ্যই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: সমকাল































