৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা !
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / 102
ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করলেও এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশটি চরমভাবে অপ্রস্তুত বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা- এটি হবেই, তবে কখন হবে তা কেউ জানে না। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থাকলেও প্রস্তুতির অভাবে এখানে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এডাব (অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ) ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “ভূমিকম্পে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।
এডাব- এর চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং এডাব পরিচালক একেএম জসীম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাপস-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার। ভূমিকম্পের কারিগরি দিক নিয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক (অপারেশন) মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ।
বক্তারা বলেন, ভবন নির্মাণ বিধিমালা না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ, গ্লাস বিল্ডিং বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ঘনবসতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, বিকল্প বহির্গমন পথের অভাব, নরম পলিমাটিতে স্থাপনা নির্মাণ, দুর্নীতি, জনসচেতনতার ঘাটতি ও কুসংস্কার- এসবই ভূমিকম্পে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, ভূমিকম্প হলে গ্রামের তুলনায় শহরে ক্ষয়ক্ষতি হবে ভয়াবহ। ঢাকা শহরে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১০ লক্ষাধিক ভবন ধসে পড়তে পারে এবং জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। উদ্ধারকাজ পরিচালনা, মরদেহ অপসারণ এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ অপ্রতুল। হাসপাতাল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। রাস্তাঘাট ধসে পড়ায় উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর পৌঁছানোও কঠিন হয়ে যাবে। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, অথচ পানি সরবরাহ থাকবে না।
বক্তারা বলেন, আমরা কার্যত নিজেদের তৈরি করা ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর মধ্যেই বসবাস করছি। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা মোকাবেলায় ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। ভূমিকম্পের আগে, চলাকালীন এবং পরবর্তী করণীয় বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ও সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার, সিভিল ডিফেন্স শক্তিশালীকরণ, কমিউনিটি ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর দায়িত্ব প্রদান, তথ্যভিত্তিক কমিউনিটি হাব স্থাপন, ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক ট্রমা মোকাবেলায় হাসপাতালভিত্তিক সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
এছাড়া জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে শক্তিশালী করা, পর্যাপ্ত রিসোর্স ও দক্ষ জনবল নিয়োগ, পানি ও রাস্তার অবকাঠামো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভূমিকম্প সংক্রান্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান বক্তারা।
বক্তারা বলেন, ভূমিকম্প প্রাকৃতিক হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট। এসব ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস—এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা বলেন, সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দায়িত্বশীল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
সভায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল মানুষের জীবনের মূল্য সমান- এই নীতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন বক্তারা।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু, ডিজাস্টার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নাঈম ওয়ারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান।
































