১২ বছর পর পর্তুগালে শ্রমিক জোটের বৃহৎ ধর্মঘট
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:০৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 120
২০১৩ সালের পর এমন দৃশ্য আর দেখা যায়নি—পর্তুগালে আবারও বড় শ্রমিক ধর্মঘটের স্বাক্ষী হলো দেশ। সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত নতুন শ্রম আইনকে কেন্দ্র করে দেশের দুই প্রধান শ্রমিক কনফেডারেশন সিজিটিপি এবং ইউজিটি একযোগে রাস্তায় নেমেছে। ২০১৩ সালের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতির সময় যে ব্যাপক ধর্মঘট হয়েছিল, তার পর প্রায় এক যুগে এমন সার্বজনীন আন্দোলন আর দেখা যায়নি।
আজকের ধর্মঘট শুধুমাত্র এক দিনের কর্মবিরতি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শ্রমিক অসন্তোষের প্রকাশ। প্রায় সব খাতের শ্রমিক আজ রাস্তায় নেমে জানিয়েছেন—কোনোভাবেই তারা কর্মক্ষেত্রের অধিকার ও নিরাপত্তার ওপর আপস করবে না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নতুন আইন শ্রমিকদের অধিকার দুর্বল করবে এবং নিয়োগকর্তাদের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। প্রধান আপত্তিগুলো হলো:
স্থায়ী চাকরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সহজীকরণ
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী নিয়োগকর্তারা অস্থায়ী বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ব্যবহার আরও সহজে করতে পারবে। ইউনিয়নের মতে, এটি চাকরির স্থায়িত্বকে বিপর্যস্ত করবে এবং একটি পুরো প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলবে।
অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও নমনীয় সময়সূচি
আইন কার্যকর হলে কর্মীকে পরিবর্তনশীল শিফট ও অতিরিক্ত সময়ের কাজে বাধ্য করা আরও সহজ হবে। এর ফলে ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবনের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং কর্মীর ওপর চাপ বাড়বে।
ওভারটাইম ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার সংকোচন
শ্রমিকরা আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য ভাতা কমে যেতে পারে এবং অসুস্থতা, মাতৃত্ব–পিতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা ঝুঁকিতে পড়বে।
কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়ার সহজীকরণ
ইউনিয়নগুলো মনে করছে, এই ধারা মালিকপক্ষকে সহজে কর্মী ছাঁটাইয়ের সুযোগ দেবে।
১১ ডিসেম্বর ভোর থেকে দেশব্যাপী পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ট্রেন ও মেট্রোর অনেক রুট বাতিল, বাস পরিষেবা সীমিত, স্কুলে ছাত্র উপস্থিতি কম, হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরে কার্যক্রম সীমিত। লিসবন, পোর্তো, ব্রাগা, ভিয়ানা দো কাস্তেলো, ফারোসহ প্রায় সব বড় শহরে শ্রমিকরা সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধনে অংশ নেয়। লিসবনের অ্যাভেনিদা দা লিবার্দাদে রাস্তায় ভিড়ে বাড়তি নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়।
২০১৩ সালের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির স্মৃতি এখনও তাজা—বেতন স্থবিরতা ও সুবিধা কাটছাঁট কর্মজীবীদের জীবন কঠিন করে তুলেছিল। শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন, এখন প্রস্তাবিত নতুন আইন আবারও অধিকার সংকুচিত করবে।
একজন বন্দর শ্রমিক বলেন, “২০১৩ থেকে আমরা ধৈর্য ধরেছি। কিন্তু এখন সরকার যে আইন আনতে চাইছে, তা আমাদের ভবিষ্যত পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে।”
সরকার দাবি করছে, নতুন আইন শ্রমবাজারকে আধুনিক করবে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। তবে তারা জানিয়েছে, গঠনমূলক আলোচনায় ইউনিয়নের সঙ্গে বসতে সরকার প্রস্তুত।
বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পর্তুগালের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। নিম্ন বেতন, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং চাকরির অনিশ্চয়তা কর্মজীবী শ্রেণির মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। নতুন আইন প্রস্তাব সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো—১২ বছর পর এত বড় ধর্মঘট কেন?
কারণগুলো হলো দীর্ঘদিন ধরে স্থবির মজুরি, অস্থায়ী চাকরির প্রবণতা বৃদ্ধি, বাড়তি ভাড়া, খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নতুন আইনের মাধ্যমে অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা।
ধর্মঘটের ব্যাপক সাফল্যের পর শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, সরকার আলোচনায় না বসলে আরও বড় কর্মসূচি আসতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধর্মঘট পর্তুগালের শ্রমবাজার ও রাজনৈতিক পরিবেশ—দুয়ের ওপরই প্রভাব ফেলবে।

































