ঢাকা ০২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং প্রতিরোধের উপায়

হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৬:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / 208

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং প্রতিরোধের উপায়

সাইবার অপরাধীরা দিন দিন বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল যুগে যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছি, সেখানেই ঘাপটি মেরে আছে কিছু সাইবার অপরাধী, যারা সবার অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিতে সর্বদা প্রস্তুত।

 

আপনার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মান কেড়ে নেওয়ার জন্য তারা নতুন এক মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে – যা পরিচিতি পেয়েছে “হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং” হিসেবে।

 

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে ফাঁদ পাতা হচ্ছে , তা বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জন্য এক নীরব হুমকি। এটি এতটাই মারাত্মক যে, মুহূর্তের অসাবধানতায় আপনার একান্ত ব্যক্তিগত স্পেসে ঢুকে আপনার জীবনকে ওলটপালট করে দিতে পারে।

 

কীভাবে কাজ করে এই জঘন্য ফাঁদ? ধাপে ধাপে জেনে নিন:

 

১. আনসেভ নাম্বার থেকে কল: আপনার ফোনে হঠাৎ করেই একটি অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল আসবে। এই নম্বরটি দেশি বা বিদেশি যেকোনো প্রিফিক্স ব্যবহার করতে পারে, যা আপনাকে ধোঁকা দিতে যথেষ্ট। অনেক সময় তারা এমন প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করে যা আপনাকে কল ধরতে উৎসাহিত করবে।

 

২. না বুঝে ভুল: অধিকাংশ মানুষ কৌতূহলবশত অথবা কাজের চাপ বা মনোযোগের অভাবে না বুঝেই কলটি রিসিভ করে ফেলে। কেউ কেউ হয়তো ভাবে, পরিচিত কেউ নতুন নম্বর থেকে কল দিচ্ছে। আর এই মুহূর্তের সিদ্ধান্তই আপনাকে ফেলে দেয় মহা বিপদে।

 

৩. ভিডিও কলে পর্নোগ্রাফি: কল রিসিভ করার সাথে সাথেই বিপরীত প্রান্ত থেকে কোনো ব্যক্তি কথা বলার বদলে তাদের মোবাইল স্ক্রিনে কোনো নগ্ন, অশ্লীল বা আপত্তিকর ভিডিও চালানো শুরু করে। সাধারণত, এই ভিডিওগুলো খুবই কম সময়ের হয়, হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত দৃশ্যে বেশিরভাগ মানুষই হতভম্ব হয়ে পড়ে।

 

৪. আসল কাজ স্ক্রিন রেকর্ডিং: ঠিক এই একই সময়ে, ব্ল্যাকমেলার হ্যাকাররা তাদের নিজেদের ফোন বা কম্পিউটার থেকে আপনার ভিডিও কলের একটি স্ক্রিন রেকর্ডিং করে নেয়। তাদের মূল কারসাজি এখানেই। তারা এমনভাবে ক্যামেরা ও স্ক্রিনের ফোকাস সেট করে, যাতে আপনার মুখ এবং আপনার মোবাইলের স্ক্রিন একই ফ্রেমে আসে। যেহেতু আপনার স্ক্রিনে তখন অশ্লীল ভিডিওটি চলছিল, রেকর্ডিংয়ে এমনটা মনে হয় যেন আপনি নিজেই সেটিকে দেখছেন। অনেক সময় তারা এমনভাবে আপনার অভিব্যক্তি ধারণ করার চেষ্টা করে, যা তারা পরবর্তীতে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।

 

৫. ভিডিও তৈরি ও ভুক্তভোগী নির্বাচন: এই রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে তারা একটি এডিটেড ভিডিও তৈরি করে। এই ভিডিওটি খুবই স্পর্শকাতর, কারণ এটি দেখে মনে হয় আপনি স্বেচ্ছায় পর্নোগ্রাফি দেখছেন অথবা আপত্তিকর কোনো কাজে লিপ্ত আছেন। এই ভিডিওটিই তাদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

 

৬. মানসিক টর্চার ও চাঁদাবাজি: ভিডিওটি তৈরি হয়ে গেলে, ব্ল্যাকমেলাররা ভিক্টিমকে ওই নাম্বার বা অন্য কোনো নাম্বার থেকে কন্টাক্ট করে। তারা ওই এডিটেড ভিডিওটি দেখিয়ে টাকা দাবি করে, যা সাধারণত মোটা অঙ্কের হয়। তারা ভিক্টিমকে ভয় দেখায় যে, যদি টাকা না দেন, তাহলে এই ভিডিওটি আপনার পরিবার (স্ত্রী/স্বামী, সন্তান, বাবা-মা), নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, কর্মস্থল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব) ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আপনার সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, কর্মজীবনের খ্যাতি সবকিছু এক নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে ভয়ে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়।

 

কেন আপনি এই ফাঁদে পড়তে পারেন?

* অজ্ঞতা ও অসতর্কতা: এই নতুন কৌশল সম্পর্কে ধারণা না থাকা।
* কৌতূহল: অপরিচিত ভিডিও কল এলে অনেকেই কৌতূহলবশত রিসিভ করে ফেলেন।
* ভয় ও লজ্জা: ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়ার পর বেশিরভাগ মানুষই লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে থাকেন এবং অপরাধীদের দাবি মেনে নেন।
* প্রাইভেসি সেটিংস সম্পর্কে ধারণা না থাকা: হোয়াটসঅ্যাপের সিকিউরিটি ফিচার সম্পর্কে না জানার কারণে নিজেদের অজান্তেই বিপদ ডেকে আনা।

 

নিজেকে সেফ রাখার কার্যকরী উপায়সমূহ:

১. সবসময় অপরিচিত ভিডিও কল এড়িয়ে চলুন: এটিই আপনার প্রথম এবং প্রধান প্রতিরক্ষা হাতিয়ার । আপনার কন্টাক্ট লিস্টে নেই এমন কোনো নম্বর থেকে ভিডিও কল এলে তা রিসিভ করবেন না, বরং সরাসরি কেটে দিন। প্রয়োজনে সেই নম্বরটি ব্লক করে দিন।

 

২. হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস আপডেট করুন:
* হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করুন।
* Settings (সেটিংস) অপশনে যান।
* Account (অ্যাকাউন্ট) > Privacy (গোপনীয়তা) নির্বাচন করুন।
* “Calls” (কল) অপশনে গিয়ে “Silence unknown callers” অপশনটি চালু করুন। এর ফলে আপনার পরিচিত নয় এমন নম্বর থেকে আসা কলগুলো আপনার ফোন সাইলেন্ট করে দেবে এবং আপনাকে নোটিফাইড বা বিরক্ত করবে না।
* এছাড়াও, “Last seen and online”, “Profile photo”, “About”, “Status” অপশনগুলো “My Contacts” বা “Nobody” করে রাখুন, যাতে অপরিচিতরা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে না পারে।

 

৩. যদি ফাঁদে পড়েই যান, ভুলেও টাকা দেবেন না: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। মনে রাখবেন, একবার টাকা দিলে ব্ল্যাকমেলারদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। তারা বুঝতে পারবে যে আপনি ভয় পেয়েছেন এবং তারা বারবার আপনাকে হয়রানি করবে। আপনার টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। টাকা দিলেই যে ভিডিও ডিলিট করে দিবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

৪. ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিন:
* মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। আপনি কোনো অপরাধ করেননি, বরং আপনি স্ক্যামিং এর শিকার।
* অপরাধীদের সাথে আপনার কথোপকথনের স্ক্রিনশট, তাদের পাঠানো হুমকি বা ভিডিওর প্রমাণ (যদি থাকে) সংগ্রহ করুন।
* দেরি না করে দ্রুত আপনার নিকটস্থ থানা বা বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করুন।

 

৫. বিষয়টি বিশ্বস্ত কারো সাথে শেয়ার করুন: আপনার পরিবারের সদস্য, বিশ্বস্ত বন্ধু অথবা আইনি পরামর্শদাতার সাথে বিষয়টি আলোচনা করুন। মনের ভেতরে চেপে রাখলে মানসিক চাপ আরও বাড়বে। তাদের সহায়তা আপনাকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তি যোগাবে।

 

৬. সচেতনতা বৃদ্ধি করুন: আপনার আশেপাশের মানুষ যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত করুন। সচেতনতাই পারে এই ধরনের সাইবার অপরাধ রুখে দিতে।

 

আপনি কোনোভাবেই দোষী নন, বরং আপনি এক জঘন্য সাইবার স্ক্যামিং এর শিকার। ভয় না পেয়ে রুখে দাঁড়ান। আপনার সম্মান ও অর্থ সুরক্ষিত রাখা আপনার অধিকার। আসুন, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে সাইবার জগতে সুরক্ষিত থাকি এবং অপরাধীদের যেকোনো অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেই।

লেখক: হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক

 

আরো পড়তে পারেন 

এআই ভয়েস ক্লোন স্ক্যামিং থেকে বাঁচবেন কিভাবে?

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং প্রতিরোধের উপায়

সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৬:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

সাইবার অপরাধীরা দিন দিন বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল যুগে যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছি, সেখানেই ঘাপটি মেরে আছে কিছু সাইবার অপরাধী, যারা সবার অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিতে সর্বদা প্রস্তুত।

 

আপনার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মান কেড়ে নেওয়ার জন্য তারা নতুন এক মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে – যা পরিচিতি পেয়েছে “হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল ব্ল্যাকমেইলিং” হিসেবে।

 

হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে ফাঁদ পাতা হচ্ছে , তা বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জন্য এক নীরব হুমকি। এটি এতটাই মারাত্মক যে, মুহূর্তের অসাবধানতায় আপনার একান্ত ব্যক্তিগত স্পেসে ঢুকে আপনার জীবনকে ওলটপালট করে দিতে পারে।

 

কীভাবে কাজ করে এই জঘন্য ফাঁদ? ধাপে ধাপে জেনে নিন:

 

১. আনসেভ নাম্বার থেকে কল: আপনার ফোনে হঠাৎ করেই একটি অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল আসবে। এই নম্বরটি দেশি বা বিদেশি যেকোনো প্রিফিক্স ব্যবহার করতে পারে, যা আপনাকে ধোঁকা দিতে যথেষ্ট। অনেক সময় তারা এমন প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করে যা আপনাকে কল ধরতে উৎসাহিত করবে।

 

২. না বুঝে ভুল: অধিকাংশ মানুষ কৌতূহলবশত অথবা কাজের চাপ বা মনোযোগের অভাবে না বুঝেই কলটি রিসিভ করে ফেলে। কেউ কেউ হয়তো ভাবে, পরিচিত কেউ নতুন নম্বর থেকে কল দিচ্ছে। আর এই মুহূর্তের সিদ্ধান্তই আপনাকে ফেলে দেয় মহা বিপদে।

 

৩. ভিডিও কলে পর্নোগ্রাফি: কল রিসিভ করার সাথে সাথেই বিপরীত প্রান্ত থেকে কোনো ব্যক্তি কথা বলার বদলে তাদের মোবাইল স্ক্রিনে কোনো নগ্ন, অশ্লীল বা আপত্তিকর ভিডিও চালানো শুরু করে। সাধারণত, এই ভিডিওগুলো খুবই কম সময়ের হয়, হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত দৃশ্যে বেশিরভাগ মানুষই হতভম্ব হয়ে পড়ে।

 

৪. আসল কাজ স্ক্রিন রেকর্ডিং: ঠিক এই একই সময়ে, ব্ল্যাকমেলার হ্যাকাররা তাদের নিজেদের ফোন বা কম্পিউটার থেকে আপনার ভিডিও কলের একটি স্ক্রিন রেকর্ডিং করে নেয়। তাদের মূল কারসাজি এখানেই। তারা এমনভাবে ক্যামেরা ও স্ক্রিনের ফোকাস সেট করে, যাতে আপনার মুখ এবং আপনার মোবাইলের স্ক্রিন একই ফ্রেমে আসে। যেহেতু আপনার স্ক্রিনে তখন অশ্লীল ভিডিওটি চলছিল, রেকর্ডিংয়ে এমনটা মনে হয় যেন আপনি নিজেই সেটিকে দেখছেন। অনেক সময় তারা এমনভাবে আপনার অভিব্যক্তি ধারণ করার চেষ্টা করে, যা তারা পরবর্তীতে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।

 

৫. ভিডিও তৈরি ও ভুক্তভোগী নির্বাচন: এই রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে তারা একটি এডিটেড ভিডিও তৈরি করে। এই ভিডিওটি খুবই স্পর্শকাতর, কারণ এটি দেখে মনে হয় আপনি স্বেচ্ছায় পর্নোগ্রাফি দেখছেন অথবা আপত্তিকর কোনো কাজে লিপ্ত আছেন। এই ভিডিওটিই তাদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

 

৬. মানসিক টর্চার ও চাঁদাবাজি: ভিডিওটি তৈরি হয়ে গেলে, ব্ল্যাকমেলাররা ভিক্টিমকে ওই নাম্বার বা অন্য কোনো নাম্বার থেকে কন্টাক্ট করে। তারা ওই এডিটেড ভিডিওটি দেখিয়ে টাকা দাবি করে, যা সাধারণত মোটা অঙ্কের হয়। তারা ভিক্টিমকে ভয় দেখায় যে, যদি টাকা না দেন, তাহলে এই ভিডিওটি আপনার পরিবার (স্ত্রী/স্বামী, সন্তান, বাবা-মা), নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, কর্মস্থল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব) ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আপনার সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, কর্মজীবনের খ্যাতি সবকিছু এক নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে ভয়ে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়।

 

কেন আপনি এই ফাঁদে পড়তে পারেন?

* অজ্ঞতা ও অসতর্কতা: এই নতুন কৌশল সম্পর্কে ধারণা না থাকা।
* কৌতূহল: অপরিচিত ভিডিও কল এলে অনেকেই কৌতূহলবশত রিসিভ করে ফেলেন।
* ভয় ও লজ্জা: ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়ার পর বেশিরভাগ মানুষই লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে থাকেন এবং অপরাধীদের দাবি মেনে নেন।
* প্রাইভেসি সেটিংস সম্পর্কে ধারণা না থাকা: হোয়াটসঅ্যাপের সিকিউরিটি ফিচার সম্পর্কে না জানার কারণে নিজেদের অজান্তেই বিপদ ডেকে আনা।

 

নিজেকে সেফ রাখার কার্যকরী উপায়সমূহ:

১. সবসময় অপরিচিত ভিডিও কল এড়িয়ে চলুন: এটিই আপনার প্রথম এবং প্রধান প্রতিরক্ষা হাতিয়ার । আপনার কন্টাক্ট লিস্টে নেই এমন কোনো নম্বর থেকে ভিডিও কল এলে তা রিসিভ করবেন না, বরং সরাসরি কেটে দিন। প্রয়োজনে সেই নম্বরটি ব্লক করে দিন।

 

২. হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস আপডেট করুন:
* হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করুন।
* Settings (সেটিংস) অপশনে যান।
* Account (অ্যাকাউন্ট) > Privacy (গোপনীয়তা) নির্বাচন করুন।
* “Calls” (কল) অপশনে গিয়ে “Silence unknown callers” অপশনটি চালু করুন। এর ফলে আপনার পরিচিত নয় এমন নম্বর থেকে আসা কলগুলো আপনার ফোন সাইলেন্ট করে দেবে এবং আপনাকে নোটিফাইড বা বিরক্ত করবে না।
* এছাড়াও, “Last seen and online”, “Profile photo”, “About”, “Status” অপশনগুলো “My Contacts” বা “Nobody” করে রাখুন, যাতে অপরিচিতরা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে না পারে।

 

৩. যদি ফাঁদে পড়েই যান, ভুলেও টাকা দেবেন না: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। মনে রাখবেন, একবার টাকা দিলে ব্ল্যাকমেলারদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। তারা বুঝতে পারবে যে আপনি ভয় পেয়েছেন এবং তারা বারবার আপনাকে হয়রানি করবে। আপনার টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। টাকা দিলেই যে ভিডিও ডিলিট করে দিবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

৪. ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিন:
* মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। আপনি কোনো অপরাধ করেননি, বরং আপনি স্ক্যামিং এর শিকার।
* অপরাধীদের সাথে আপনার কথোপকথনের স্ক্রিনশট, তাদের পাঠানো হুমকি বা ভিডিওর প্রমাণ (যদি থাকে) সংগ্রহ করুন।
* দেরি না করে দ্রুত আপনার নিকটস্থ থানা বা বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করুন।

 

৫. বিষয়টি বিশ্বস্ত কারো সাথে শেয়ার করুন: আপনার পরিবারের সদস্য, বিশ্বস্ত বন্ধু অথবা আইনি পরামর্শদাতার সাথে বিষয়টি আলোচনা করুন। মনের ভেতরে চেপে রাখলে মানসিক চাপ আরও বাড়বে। তাদের সহায়তা আপনাকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তি যোগাবে।

 

৬. সচেতনতা বৃদ্ধি করুন: আপনার আশেপাশের মানুষ যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত করুন। সচেতনতাই পারে এই ধরনের সাইবার অপরাধ রুখে দিতে।

 

আপনি কোনোভাবেই দোষী নন, বরং আপনি এক জঘন্য সাইবার স্ক্যামিং এর শিকার। ভয় না পেয়ে রুখে দাঁড়ান। আপনার সম্মান ও অর্থ সুরক্ষিত রাখা আপনার অধিকার। আসুন, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে সাইবার জগতে সুরক্ষিত থাকি এবং অপরাধীদের যেকোনো অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেই।

লেখক: হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক

 

আরো পড়তে পারেন 

এআই ভয়েস ক্লোন স্ক্যামিং থেকে বাঁচবেন কিভাবে?