ঢাকা ০৭:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১১ বছর একই স্থানে এই প্রকেীশলী

হাজারীর ছায়ায় বিলাসী জীবন ফেনীর এক প্রকৌশলীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:২৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫
  • / 4162

হাজারীর দুষ্টচক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন আনোয়ার

ফেনী পৌরসভার এক উপ-সহকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আনোয়ার হোসেন সুমন নামের ওই প্রকৌশলী ১১ বছর একই স্থানে কর্মরত আছেন। কয়েক দফা বদলির তোরজোড় হলেও তার ক্ষমতার কাছে তা আটকে যায়। এই প্রকৌশলী ফেনী- ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৫ বছর ফেনী পৌরসভায় রামরাজত্ব চালিয়েছে ছয় সদস্যের একটি চক্র। এই চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন আনোয়ার হোসেন। এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আবুজর গিফরী। অন্য সদস্যরা হলেন-নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক, বিদ্যুৎ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হিরণ মিয়া, নকশাকারক বোরহান উদ্দিন রাব্বানি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা শরাফত উল্যা চৌধুরী। নিজাম হাজারীর সঙ্গে সখ্যকে লুটপাটে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করেছেন তারা।

এই চক্রের দুর্নীতির একটি চিত্র গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতন তথা নিজাম হাজারীর পলায়নের পর প্রকাশ্যে আসে। বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর গত আগস্টে কনজারভেন্সি শাখার কর্মচারীদের বেতন বাবদ ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ গত ১৫ বছর এ শাখা থেকে প্রতি মাসে এ খাতে ব্যয় ছিল ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। দুই ঈদে অতিরিক্ত ৬৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হতো। প্রতি মাসে ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করা হতো অন্তত ১৬ লাখ টাকা। বছরে টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৯২ লাখের বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি মাসে আড়াইশ কর্মচারীর বেতন তোলা হতো। অথচ আগস্টে বেতন দিতে হয়েছে মাত্র ১২০ জনকে! আর এভাবে এই একটি খাত থেকেই ১৫ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। আর এর প্রমাণ নষ্ট করতে ৫ আগস্টের পর পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রচার চালানো হয়, উত্তেজিত ছাত্র-জনতা ওই আগুন দিয়েছে।

ইতোমধ্যে এই চক্রের বেশ কয়েক জনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। কিন্তু এতো এতো অভিযোগের পরেও বীরদর্পে বহাল রয়েছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি ফেনী জেলার স্থায়ী বাসিন্ধা। চাকরিজীবনের শুরু নোয়াখালিতে। এরপর গত প্রায় একযুগ ধরে তিনি নিজ বাড়ির এলাকাতেই কর্মরত। চক্রের অন্য সদস্যদের বদলির পর এখন তার নেতৃত্বেই নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে সুমন; ফেনী- ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর ভাগ্নে বলে পরিচয় দিতেন তিনি। এ পরিচয়ের সূত্র ধরেই সুমন পৌরসভার ভেতরে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাবান। তাছাড়া স্থানীয় হওয়ার বরাবরই তার দাপট ছিলো পৌরসভার অন্যদের চেয়ে আলাদা।

মাস্টার রোলে নিয়োগ অবৈধ হলেও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা শরাফত উল্যা চৌধুরী ৫০ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও টেন্ডার-কোটেশন ছাড়াই আনোয়ার হোসেন সুমন ও শরাফত উল্যা চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতকোটি টাকার কেনাকাটা দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। উৎকোচের বিনিময়ে সম্প্রসারিত ভবনের পৌর কর না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া নতুন হোল্ডিং, মিউটেশন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, ভবনের নকশা অনুমোদন, যৌথ জরিপ, ট্রেড লাইসেন্স দিতে ঘুষ প্রদানকে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিকীকরন করেন তিনি।
সুমনের অবৈধ আয়ের আরও খাতের মধ্যে আছে, হাট-বাজার ইজারার কোটি কোটি টাকা পৌরসভার তহবিলে জমা না দেওয়া, পৌরসভার ভূমি লিজ-দোকান বরাদ্দ ও মিউটেশনে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া, মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের রাজস্ব জমা না দিয়ে নিজস্ব লোকের মাধ্যমে আদায় করা থেকে।

রিকশা, সিএনজি, পৌর টাউন সার্ভিস এসব গাড়ির লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে দৈনিক ৫০ থেকে মাসিক ৫০ হাজার টাকা করে নেন। পৌরসভা কর্তৃক অবৈধ যানের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করারও অভিযোগ রয়েছে।

আনোয়ার হোসেন সুমন সিন্ডিকেটের লোপাটের অন্য ক্ষেত্রগুলো হলো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন দেখিয়ে বছরে অন্তত কোটি টাকা আত্মসাৎ। পাশাপাশি ‘সুইপার বিল’ নাম দিয়ে মাসে দুই বা ততোধিকবার প্রায় লাখ টাকা করে ১০ বছর ধরে তুলেছে চক্রটি। অর্থাৎ এ খাতে ১৫-২০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

জাল নথিতে নামে-বেনামে কোটি টাকা লোপাট করেছেন এই প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকৌশলী বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার বলেন, ফেনী পৌরসভার সব উন্নয়ন কাজ শেষে পৌর পরিষদে অনুমোদন করা হতো। এ কৌশলকে পুঁজি করে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন সব কাজে ৫০-৮০% অতিরিক্ত টাকা ধরে বিল প্রস্তুত করতেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে এ টাকা সুমন আদায় করে নিতেন। আর এ কাজে তারা নিজাম হাজারীর নাম ভাঙাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় আনোয়ারের প্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত
শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় আনোয়ারের প্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত

অন্য একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফেনী সদর ছনুয়া ইউনিয়নের নিজ এলাকায় তার নামে বেনামে বহু জায়গা জমিন রয়েছে এই প্রকৌশলীর। এছাড়া শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় ১০ কোটি টাকার ৭ তলা আনোয়ার ম্যানশন নামে আলিশান বাড়ি, ফেনী মিজান রোডে আলিয়া মাদ্রাসার পূর্বপাশে, ফজল মাস্টার ল্যান্ড রোডে অবস্থিত তার স্ত্রীর নামে রয়েছে দুটি আলিশান ফ্ল্যাট। এক একটি ফ্ল্যাট ৩০০০ স্কয়ার বর্গফুটের। আনোয়ার ম্যানশনে একটি অফিস রয়েছে; যে অফিসটিতে দুইজন ইঞ্জিনিয়ার কর্মরত আছেন। ফেনী পৌরসভায় নকশা পাস করাতে আসা গ্রাহকদের তার অফিসের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বারবার এসব নিয়ে অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য ক্ষমতার কাছে পার পেয়ে গেছেন এই প্রকৌশলী। এতে করে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মনগড়া। তিনি পৌরসভার মাত্র ৯টি ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছেন। যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো তার পারিবারিক। আর স্ত্রীর নামে যেসব সম্পদের উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো তার প্রয়াত শ্বশুরের। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে নিজাম হাজারীর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।

অভিযোগকারিদের বক্তব্য, স্থানীয় হওয়ায় অন্যদের থেকে একটু বাড়তিই ক্ষমতা ভোগ করেন আনোয়ার হোসেন। যে কারনে নিজের কর্ম এলাকার বাহিরে গিয়েও তিনি অন্যান্য কাজে প্রভাব বিস্তার করেন। তার কথার অবাধ্য হলে; ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারিদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভয়-ভীতি দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ফেনী পৌরসভার প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, অভিযোগ পেলে তিনি তদন্ত করবেন। তদন্তে দোষি প্রমানিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

১১ বছর একই স্থানে এই প্রকেীশলী

হাজারীর ছায়ায় বিলাসী জীবন ফেনীর এক প্রকৌশলীর

সর্বশেষ আপডেট ১১:২৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫

ফেনী পৌরসভার এক উপ-সহকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আনোয়ার হোসেন সুমন নামের ওই প্রকৌশলী ১১ বছর একই স্থানে কর্মরত আছেন। কয়েক দফা বদলির তোরজোড় হলেও তার ক্ষমতার কাছে তা আটকে যায়। এই প্রকৌশলী ফেনী- ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৫ বছর ফেনী পৌরসভায় রামরাজত্ব চালিয়েছে ছয় সদস্যের একটি চক্র। এই চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন আনোয়ার হোসেন। এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আবুজর গিফরী। অন্য সদস্যরা হলেন-নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক, বিদ্যুৎ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হিরণ মিয়া, নকশাকারক বোরহান উদ্দিন রাব্বানি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা শরাফত উল্যা চৌধুরী। নিজাম হাজারীর সঙ্গে সখ্যকে লুটপাটে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করেছেন তারা।

এই চক্রের দুর্নীতির একটি চিত্র গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতন তথা নিজাম হাজারীর পলায়নের পর প্রকাশ্যে আসে। বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর গত আগস্টে কনজারভেন্সি শাখার কর্মচারীদের বেতন বাবদ ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ গত ১৫ বছর এ শাখা থেকে প্রতি মাসে এ খাতে ব্যয় ছিল ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। দুই ঈদে অতিরিক্ত ৬৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হতো। প্রতি মাসে ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করা হতো অন্তত ১৬ লাখ টাকা। বছরে টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৯২ লাখের বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি মাসে আড়াইশ কর্মচারীর বেতন তোলা হতো। অথচ আগস্টে বেতন দিতে হয়েছে মাত্র ১২০ জনকে! আর এভাবে এই একটি খাত থেকেই ১৫ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। আর এর প্রমাণ নষ্ট করতে ৫ আগস্টের পর পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রচার চালানো হয়, উত্তেজিত ছাত্র-জনতা ওই আগুন দিয়েছে।

ইতোমধ্যে এই চক্রের বেশ কয়েক জনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। কিন্তু এতো এতো অভিযোগের পরেও বীরদর্পে বহাল রয়েছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি ফেনী জেলার স্থায়ী বাসিন্ধা। চাকরিজীবনের শুরু নোয়াখালিতে। এরপর গত প্রায় একযুগ ধরে তিনি নিজ বাড়ির এলাকাতেই কর্মরত। চক্রের অন্য সদস্যদের বদলির পর এখন তার নেতৃত্বেই নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে সুমন; ফেনী- ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর ভাগ্নে বলে পরিচয় দিতেন তিনি। এ পরিচয়ের সূত্র ধরেই সুমন পৌরসভার ভেতরে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাবান। তাছাড়া স্থানীয় হওয়ার বরাবরই তার দাপট ছিলো পৌরসভার অন্যদের চেয়ে আলাদা।

মাস্টার রোলে নিয়োগ অবৈধ হলেও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা শরাফত উল্যা চৌধুরী ৫০ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও টেন্ডার-কোটেশন ছাড়াই আনোয়ার হোসেন সুমন ও শরাফত উল্যা চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতকোটি টাকার কেনাকাটা দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। উৎকোচের বিনিময়ে সম্প্রসারিত ভবনের পৌর কর না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া নতুন হোল্ডিং, মিউটেশন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, ভবনের নকশা অনুমোদন, যৌথ জরিপ, ট্রেড লাইসেন্স দিতে ঘুষ প্রদানকে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিকীকরন করেন তিনি।
সুমনের অবৈধ আয়ের আরও খাতের মধ্যে আছে, হাট-বাজার ইজারার কোটি কোটি টাকা পৌরসভার তহবিলে জমা না দেওয়া, পৌরসভার ভূমি লিজ-দোকান বরাদ্দ ও মিউটেশনে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া, মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের রাজস্ব জমা না দিয়ে নিজস্ব লোকের মাধ্যমে আদায় করা থেকে।

রিকশা, সিএনজি, পৌর টাউন সার্ভিস এসব গাড়ির লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে দৈনিক ৫০ থেকে মাসিক ৫০ হাজার টাকা করে নেন। পৌরসভা কর্তৃক অবৈধ যানের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করারও অভিযোগ রয়েছে।

আনোয়ার হোসেন সুমন সিন্ডিকেটের লোপাটের অন্য ক্ষেত্রগুলো হলো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন দেখিয়ে বছরে অন্তত কোটি টাকা আত্মসাৎ। পাশাপাশি ‘সুইপার বিল’ নাম দিয়ে মাসে দুই বা ততোধিকবার প্রায় লাখ টাকা করে ১০ বছর ধরে তুলেছে চক্রটি। অর্থাৎ এ খাতে ১৫-২০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

জাল নথিতে নামে-বেনামে কোটি টাকা লোপাট করেছেন এই প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকৌশলী বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার বলেন, ফেনী পৌরসভার সব উন্নয়ন কাজ শেষে পৌর পরিষদে অনুমোদন করা হতো। এ কৌশলকে পুঁজি করে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন সব কাজে ৫০-৮০% অতিরিক্ত টাকা ধরে বিল প্রস্তুত করতেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে এ টাকা সুমন আদায় করে নিতেন। আর এ কাজে তারা নিজাম হাজারীর নাম ভাঙাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় আনোয়ারের প্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত
শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় আনোয়ারের প্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত

অন্য একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফেনী সদর ছনুয়া ইউনিয়নের নিজ এলাকায় তার নামে বেনামে বহু জায়গা জমিন রয়েছে এই প্রকৌশলীর। এছাড়া শহরের পূর্ব উকিল পাড়ায় ১০ কোটি টাকার ৭ তলা আনোয়ার ম্যানশন নামে আলিশান বাড়ি, ফেনী মিজান রোডে আলিয়া মাদ্রাসার পূর্বপাশে, ফজল মাস্টার ল্যান্ড রোডে অবস্থিত তার স্ত্রীর নামে রয়েছে দুটি আলিশান ফ্ল্যাট। এক একটি ফ্ল্যাট ৩০০০ স্কয়ার বর্গফুটের। আনোয়ার ম্যানশনে একটি অফিস রয়েছে; যে অফিসটিতে দুইজন ইঞ্জিনিয়ার কর্মরত আছেন। ফেনী পৌরসভায় নকশা পাস করাতে আসা গ্রাহকদের তার অফিসের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বারবার এসব নিয়ে অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য ক্ষমতার কাছে পার পেয়ে গেছেন এই প্রকৌশলী। এতে করে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সুমন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মনগড়া। তিনি পৌরসভার মাত্র ৯টি ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছেন। যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো তার পারিবারিক। আর স্ত্রীর নামে যেসব সম্পদের উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো তার প্রয়াত শ্বশুরের। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে নিজাম হাজারীর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।

অভিযোগকারিদের বক্তব্য, স্থানীয় হওয়ায় অন্যদের থেকে একটু বাড়তিই ক্ষমতা ভোগ করেন আনোয়ার হোসেন। যে কারনে নিজের কর্ম এলাকার বাহিরে গিয়েও তিনি অন্যান্য কাজে প্রভাব বিস্তার করেন। তার কথার অবাধ্য হলে; ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারিদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভয়-ভীতি দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ফেনী পৌরসভার প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, অভিযোগ পেলে তিনি তদন্ত করবেন। তদন্তে দোষি প্রমানিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।