বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন
সেনা কর্মকর্তাদের বিচারে কী প্রভাব পড়বে?
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩১:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫
- / 171
বাংলাদেশে গুম সংক্রান্ত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৫ জন কর্মরত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একযোগে এতজন সেনা কর্মকর্তাকে বেসামরিক (সিভিল) আদালতে বিচারের ঘটনা বিরল। এরপর থেকে সিভিল আদালতে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার, সরকার-সেনা সম্পর্ক এবং সেনাবাহিনীতে এর প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
শনিবার ১৫ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার ঘটনার পর সেনাবাহিনীকে ঘিরে নানা ধরনের গুজব, আলোচনা এবং এই প্রক্রিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণায় সয়লাব ছিল সামাজিক মাধ্যম। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি কৌশলী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, আর অন্যরা অনেকেই এ বিষয়ে নীরবতা বজায় রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, আগামী কয়েকদিনে এ ঘটনার গতি-প্রকৃতি আরও পরিষ্কার হবে। মূলত এরপরই চূড়ান্তভাবে এসব কর্মকর্তার বিষয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান জানা যাবে।
একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনাটি যেভাবে জনসম্মুখে প্রচার করা হয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেখা যেতে পারে।”
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন— গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে থাকায় এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর কোনো ক্ষতি হবে না।
বেসামরিক আদালতে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠলেও ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শনিবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, গুমের দুই মামলাসহ তিন মামলায় পরোয়ানাভুক্ত ১৫ সেনা কর্মকর্তার বিচার করার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রয়েছে।
অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তারা সেনা হেফাজতে থাকবেন, নাকি অন্য আসামিদের মতোই বিবেচিত হবেন— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “আইনের সাধারণ বিধান হচ্ছে আসামিকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হয়। এরপর আদালতই সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কোথায় থাকবে।”
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ অতীতের উদাহরণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া ট্রাইব্যুনালে অগ্রসর হতে বাধা নেই।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সশস্ত্র বাহিনীর আর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরিকল্পনা নেই।
ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর সেনা সদর জানায়, যেসব সেনা কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন মেজর জেনারেল, সাতজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, একজন কর্নেল, চারজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও একজন মেজর রয়েছেন। আর একজন অবসরপ্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) আছেন।
শনিবার সেনা সদরের ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান বলেন, দুটি মামলার ৩০ জন আসামির মধ্যে ২৫ জনই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে নয়জন অবসরপ্রাপ্ত, একজন এলপিআরে গেছেন এবং বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৫ জন।
এর আগে ৮ অক্টোবর ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদের ২২ অক্টোবরের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেয় আদালত।
এরপর থেকেই ‘সেনা কর্মকর্তাদের বেসামরিক আদালতে বিচার’ ইস্যুতে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়।
সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, সামরিক আইনেই যে কোনো অপরাধের বিচারের সুযোগ রয়েছে। তাই কেউ কেউ মনে করছেন, বিষয়টি যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর মর্যাদার সঙ্গে যায় না।
“সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কেউ অপরাধ করলে এবং সেটি আদালতে প্রমাণিত হলে বাহিনীর ভেতরেই তার বিচার হওয়ার সুযোগ আছে। বিষয়টি এভাবে জনসম্মুখে আনার আগে সব দিক পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল,” বলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম, যিনি সামরিক আদালতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন।
তার মতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে সেনাবাহিনীর অবদানে গঠিত ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আব্দুর রব খান অবশ্য বলেন, এ ঘটনায় সেনাবাহিনী নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না; বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সহযোগিতা করায় বাহিনী প্রশংসা কুড়াবে।
“এটা পুরো বিচার প্রক্রিয়ার অংশ। এতে পুরো জাতি জড়িত। আমি মনে করি, যেভাবে এগোচ্ছে সেটি যথাযথ,” বলেন তিনি।
সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিকও বলেন, “বিডিআর বিদ্রোহে সামরিক অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছিল বেসামরিক আদালতে। সুপ্রিম কোর্টও বলেছিল, এসব মামলার বিচার নরমাল কোর্টেই হতে পারে।”
তবে আইনে যাই থাকুক, একযোগে এতজন সেনা কর্মকর্তার বিচার প্রসঙ্গ বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি প্রচারের ধরন সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এর ফলে বাহিনীর ভেতরে কেমন প্রতিক্রিয়া হয় এবং সেনা কর্তৃপক্ষ কীভাবে তা সামাল দেন, সেদিকেও সবার দৃষ্টি থাকবে। কেউ কেউ মনে করছেন, সশস্ত্র বাহিনী থেকে অন্যান্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থায় যারা ডেপুটেশনে থাকবেন, তাদের কাজেও প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোও সেনাবাহিনীর মনোভাব বিবেচনায় কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। অনেকের ধারণা, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়ে অগ্রসর হয়েছে সরকার।
বিএনপি এক বিবৃতিতে বলেছে, “সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য এই দেশের, এই মাটির গর্বিত সন্তান। তাই অধিকাংশ সেনা সদস্য নিশ্চিতভাবেই চান, সীমা লঙ্ঘনকারীরা বিচারের মুখোমুখি হোক, যাতে কোনো সরকার আর কখনো সেনাবাহিনীর কাছে গুম-খুনের মতো অন্যায় নির্দেশ দিতে না পারে।”
অর্থাৎ দলটির এই বিবৃতি অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়ে বর্তমান অগ্রগতির প্রতি একধরনের নীরব সমর্থন প্রকাশ করে।
প্রসঙ্গত, বুধবার গুমের দুই মামলায় কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বৃহস্পতিবার পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, পরোয়ানা জারির দুই দিন আগে গত সোমবার রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২০(সি) ধারা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।
প্রসিকিউটররা বলছেন, এই প্রজ্ঞাপনের ফলে ফৌজদারি অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তারা সরকারি চাকরির কোনো পদে বহাল থাকতে পারবেন না।
সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর নামে-বেনামে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তাতে পুরনো কিছু ঘটনাও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক ও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আদালতে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। তখন একদল আইনজীবী বিষয়টি উচ্চ আদালতে তুলতে চাইলেও আদালত বলেছিল, “এটি সামরিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।”
এমনকি পাকিস্তান আমলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহা হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সামরিক কর্মকর্তাদের সিভিল কোর্টে বিচার চাইলেও তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান জানান, সামরিক কর্মকর্তাদের সিভিল আদালতে বিচারের সুযোগ নেই।
তবে স্বাধীন বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার সাধারণ আদালতেই হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার বিচারও বেসামরিক আদালতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসকে হত্যা চেষ্টা মামলায় পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে সামরিক আদালতে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য পেশাগত কাজ করতে গিয়ে অপরাধ করলে তার বিচার সামরিক আইনে হবে। কিন্তু যদি সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধ করেন, তখন তার বিচার বেসামরিক আদালতে হতে কোনো বাধা নেই। এ ধরনের উদাহরণ আগেও আছে।”




































