ড্যাফোডিল ও সিটি ইউনিভার্সিটির মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিলেন সিটি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৩:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
- / 135
‘চোখের সামনে পুড়ে যাচ্ছিল আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাস। একের পর এক ভবনে আগুন ধরানো হচ্ছিল। যখন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা মেয়েদের হোস্টেলের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন আতঙ্কে কয়েকজন ছাত্রী নিচে নামার চেষ্টা করে। আমরা তাদের থামাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মানবঢাল হয়ে মেয়েদের হোস্টেল রক্ষা করে।’
রোববার রাতে সাভারের আশুলিয়ার খাগন এলাকায় ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন সিটি ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন। তার ভাষায়, সেই রাতের ভয়, আগুন আর ধ্বংসের দৃশ্য এখনো অনেক শিক্ষার্থীর মনে গভীর দাগ রেখে গেছে। আইন বিভাগের ছাত্রী সামিয়া মেহজাবিন এবং টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী নাবিলা খানম সুরাইয়া টেলিভিশনে ঘটনার বিবরণ দেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে তাদের নিয়ে কটূ মন্তব্য ছড়ায়।
ইংরেজি বিভাগের আরেক ছাত্রী কেয়া সেদিন রাতে ফেসবুক লাইভে এসে হোস্টেল রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কিছু সময়ের মধ্যেই সিটি ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা দুটি মেয়েদের হোস্টেলের সামনে জড়ো হয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন।
সংঘর্ষের পর থেকে ড্যাফোডিল ও সিটি ইউনিভার্সিটি উভয়ই বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়— নীরবতা, ভাঙচুরের চিহ্ন এবং আতঙ্কের পরিবেশ। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ই একে অপরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি)। সিটি ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রার সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন, যদিও তা এখনও মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির বক্তব্য
সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির বলেন, ‘আমাদের নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। কিছু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, অনেকে এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমরা শিক্ষার্থীদের জীবনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি— সম্পদের ক্ষতি তার তুলনায় গৌণ।’
তিনি জানান, ঘটনাটি শুরু হয় রোববার সন্ধ্যায়, যখন সিটি ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী ড্যাফোডিলের এক ছাত্রের গায়ে থুতু ফেলেন। বিষয়টি নিয়ে তর্ক-বিতর্কের পর রাত ৯টার দিকে ড্যাফোডিল শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ‘ব্যাচেলর্স প্যারাডাইস’-এ হামলা হয়। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জিম্মি করা হয়। ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
উপাচার্য জানান, সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ড্যাফোডিলের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সিটি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে আটক রাখা হয়েছিল। ‘আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। ইউজিসির কাছে আবেদন করা হয়েছে, তারা তদন্ত কমিটি গঠন করবে,’ তিনি বলেন।
সিটি ইউনিভার্সিটির দাবি
অন্যদিকে সিটি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. লুৎফর রহমান ড্যাফোডিল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে জিম্মি করিনি। বরং ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরাই আমাদের ক্যাম্পাসে হামলা চালায়, অফিসে ভাঙচুর করে, কম্পিউটার ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যেতে চায়। আমাদের শিক্ষার্থীরা তখন তাদের আটক করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৭ জনকে আটক করা হয়, তাদের মধ্যে ৬ জন আহত ছিলেন। সকালে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। বাকিদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দুপুরে ড্যাফোডিল কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’
উপাচার্যের ভাষায়, ‘আমাদের ক্যাম্পাসকে ধ্বংস করার পর এখন উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ ও ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
প্রশাসনের বক্তব্য ও শিক্ষার্থীদের ভয়
সিটি ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মীর আকতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে হামলার পরও আমরা নিরাপদ নই। ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা আমাদের ক্রমাগত হুমকি দেয়।’
ছাত্র উপদেষ্টা ড. রহমান মাহবুব জানান, ‘ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা আমাদের ক্যাম্পাসের ভেতরে ফাতেমা ও মোনা নামের ছাত্রী হোস্টেলে প্রবেশের চেষ্টা করে। আমাদের ছাত্ররা তখন মানবঢাল হয়ে ছাত্রীদের রক্ষা করে। হোস্টেলে ঢুকতে না পেরে তারা পাশের ক্যান্টিনে ভাঙচুর চালায়।’
এদিকে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়েই আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের দাবি— দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার আসল কারণ উদ্ঘাটন করা হোক এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।




































