ঢাকা ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থাই-কম্বোডিয়া সীমান্তে রক্ত, মানচিত্রে আগুন

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:৫২:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
  • / 262

থাই- কম্বোডিয়া যুদ্ধ

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়। শত বছরের পুরোনো এই দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দুটি দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের ১১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং এক সেনা সদস্য রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি আট বছরের শিশুও ছিল। কম্বোডিয়ার পক্ষে হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডের দাবি মৃতের সংখ্যা আরো বেশি, সরকারিভাবেই জানানো হয়েছে ১৬ জনের কথা, যার মধ্যে ১৫ জনই বেসামরিক নাগরিক।

কী নিয়ে এই বিরোধ?

বিরোধের মূল উৎপত্তি ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে আঁকা মানচিত্র ঘিরে। ফ্রান্স তাদের শাসনামলে যেভাবে কম্বোডিয়ার সীমানা নির্ধারণ করেছিল, তা থাইল্যান্ড মেনে নেয়নি। প্রায় ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময় উত্তেজনা দেখা গেছে।

বর্তমান সংঘাতের সূচনা মে মাসে, যখন সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গুলিবিনিময়ে এক কম্বোডিয়ান সেনা নিহত হয়। এরপর শুরু হয় নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার পালা। থাইল্যান্ড সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জারি করে, আর কম্বোডিয়া থাই পণ্য ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বর্জন করে।

বুধবার (২৩ জুলাই) থাইল্যান্ডের সেনাদের উপর স্থলমাইন বিস্ফোরণে পাঁচজন আহত হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। এর প্রেক্ষিতে থাইল্যান্ড উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত বন্ধ করে এবং নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। কম্বোডিয়া একইভাবে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি হ্রাস করে।

জাতীয়তাবাদ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনা শুধু সীমান্ত ইস্যু নয়, এর পেছনে রয়েছে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও। কম্বোডিয়ায় হুন সেন চার দশকের শাসন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন তার ছেলে হুন মানেতের কাছে। তবে দেশের নিয়ন্ত্রণ এখনও তার হাতেই।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক ম্যাট হুইলারের ভাষায়, “হুন সেন জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে ছেলের শাসনকে শক্ত ভিত্তি দিতে চাইছেন।”

থাই ও কম্বোডিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে, ছবি: রয়টার্স
থাই ও কম্বোডিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে, ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে থাইল্যান্ডেও রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। দেশটির সদ্য ক্ষমতা হারানো প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা বিতর্কে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, মূলত কম্বোডিয়ার হুন সেনের সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর।

সেখানে হুন সেনকে ‘আঙ্কেল’ সম্বোধন এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অসতর্ক মন্তব্য তার ওপর সমালোচনার ঝড় তোলে। থাইল্যান্ডে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব প্রচণ্ড, আর এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার দলের সম্পর্ক টানাপোড়েনে পড়ে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসইএএস-ইউসফ ইশাক ইনস্টিটিউটের গবেষক তিতা সাংলি বলেন, “থাই সরকার হয়তো ভাবছে, কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে তারা হারানো জনসমর্থন ফিরে পেতে পারবে।”

সমাধানের উপায় কী?

কম্বোডিয়া জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) শরণাপন্ন হলেও, থাইল্যান্ড বাধ্য না হওয়ায় এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আসিয়ান জোটের নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন, তবে জোটের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি’ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীনকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হলেও, দেশটির ‘কম্বোডিয়া ঘেঁষা’ ভাবমূর্তি থাইল্যান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।

থাইল্যান্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই বলেছেন, “আলোচনা শুরু করতে হলে যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।” অপরদিকে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত উত্তেজনা যেন এক শতাব্দী ধরে গুমরে থাকা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা মিলিয়ে এই সংঘাতের অবসান সহজ নয়। স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিক চাপ, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

থাই-কম্বোডিয়া সীমান্তে রক্ত, মানচিত্রে আগুন

সর্বশেষ আপডেট ১২:৫২:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়। শত বছরের পুরোনো এই দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দুটি দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের ১১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং এক সেনা সদস্য রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি আট বছরের শিশুও ছিল। কম্বোডিয়ার পক্ষে হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডের দাবি মৃতের সংখ্যা আরো বেশি, সরকারিভাবেই জানানো হয়েছে ১৬ জনের কথা, যার মধ্যে ১৫ জনই বেসামরিক নাগরিক।

কী নিয়ে এই বিরোধ?

বিরোধের মূল উৎপত্তি ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে আঁকা মানচিত্র ঘিরে। ফ্রান্স তাদের শাসনামলে যেভাবে কম্বোডিয়ার সীমানা নির্ধারণ করেছিল, তা থাইল্যান্ড মেনে নেয়নি। প্রায় ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময় উত্তেজনা দেখা গেছে।

বর্তমান সংঘাতের সূচনা মে মাসে, যখন সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গুলিবিনিময়ে এক কম্বোডিয়ান সেনা নিহত হয়। এরপর শুরু হয় নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার পালা। থাইল্যান্ড সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জারি করে, আর কম্বোডিয়া থাই পণ্য ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বর্জন করে।

বুধবার (২৩ জুলাই) থাইল্যান্ডের সেনাদের উপর স্থলমাইন বিস্ফোরণে পাঁচজন আহত হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। এর প্রেক্ষিতে থাইল্যান্ড উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত বন্ধ করে এবং নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। কম্বোডিয়া একইভাবে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি হ্রাস করে।

জাতীয়তাবাদ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনা শুধু সীমান্ত ইস্যু নয়, এর পেছনে রয়েছে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও। কম্বোডিয়ায় হুন সেন চার দশকের শাসন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন তার ছেলে হুন মানেতের কাছে। তবে দেশের নিয়ন্ত্রণ এখনও তার হাতেই।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক ম্যাট হুইলারের ভাষায়, “হুন সেন জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে ছেলের শাসনকে শক্ত ভিত্তি দিতে চাইছেন।”

থাই ও কম্বোডিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে, ছবি: রয়টার্স
থাই ও কম্বোডিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে, ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে থাইল্যান্ডেও রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। দেশটির সদ্য ক্ষমতা হারানো প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা বিতর্কে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, মূলত কম্বোডিয়ার হুন সেনের সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর।

সেখানে হুন সেনকে ‘আঙ্কেল’ সম্বোধন এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অসতর্ক মন্তব্য তার ওপর সমালোচনার ঝড় তোলে। থাইল্যান্ডে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব প্রচণ্ড, আর এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার দলের সম্পর্ক টানাপোড়েনে পড়ে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসইএএস-ইউসফ ইশাক ইনস্টিটিউটের গবেষক তিতা সাংলি বলেন, “থাই সরকার হয়তো ভাবছে, কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে তারা হারানো জনসমর্থন ফিরে পেতে পারবে।”

সমাধানের উপায় কী?

কম্বোডিয়া জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) শরণাপন্ন হলেও, থাইল্যান্ড বাধ্য না হওয়ায় এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আসিয়ান জোটের নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন, তবে জোটের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি’ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীনকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হলেও, দেশটির ‘কম্বোডিয়া ঘেঁষা’ ভাবমূর্তি থাইল্যান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।

থাইল্যান্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই বলেছেন, “আলোচনা শুরু করতে হলে যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।” অপরদিকে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত উত্তেজনা যেন এক শতাব্দী ধরে গুমরে থাকা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা মিলিয়ে এই সংঘাতের অবসান সহজ নয়। স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিক চাপ, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।