ঢাকা ১১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
তদন্তে বেড়িয়ে এলো কোটি টাকার দুর্নীতি

বিমানের দুই কর্মকর্তার পরকীয়া নিয়ে রাস্তায় হাতাহাতি

শরিয়ত খান, বিশেষ প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 22

বিমানের কর্মকর্তা ফিরোজ-উজ-জামান ও জান্নাতুল জেনান।

রাজধানীর উত্তরায় প্রকাশ্যে মারধরের একটি সিটিটিভি ফ্যুটেজের জট খুলতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া বিমান কর্তৃপক্ষের। তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে বিমানের দুই কর্মকর্তার পরকীয়া প্রেমের ঘটনা। ওই দুই কর্মকর্তা কেবল পরকীয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; তারা দুজনে মিলে একটি সিন্ডিকেট করে বিমানের বেশ কিছু দাপ্তরিক অনিয়ম ও কোটি টাকা আত্নসাতেও জড়িয়ে পড়েন।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে, গত বছরের ৯ অক্টোবর দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি আবাসিক এলাকার সামনের একটি মারধরের ঘটনা থেকে। বাড়ির সিসি টিভি ফ্যুটেজে দেখা যায়, একটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছিলেন বিমানের জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার (জেজিএসও) ফিরোজ-উজ-জামান (পি-৩৬৫০৭)।

হঠাৎ দৌড়ে এসে তাকে গাড়ি থেকে টেনে নামান আরেক ব্যক্তি। মুহুর্তেই শুরু হয় মারধর। আশপাশে লোকজন জড়ো হলেও ফিরোজ কোনো প্রতিরোধ করেননি। নীরবে মার সহ্য করতে দেখা যায় তাকে।

ভিডিও কনটেন্ট দেখতে ক্লিক করুন https://www.facebook.com/share/v/1A6imJxvw2/

 

ঘটনার পর জানা যায়, হামলাকারী ব্যক্তি হলেন বিমান গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানের স্বামী সাহেদ মাহমুদ সজল। সজলের অভিযোগ, তার স্ত্রী জান্নাতুল জেনানের ((জি-৫৩০০৮) সঙ্গে সহকর্মী ফিরোজ-উজ-জামানের দীর্ঘদিনের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল।

যে বাড়ির সামনে এই হাতাহাতির ঘটনা ঘটে, সেখানেই জান্নাতুল জেনান তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। সজলের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাড়িতে ফিরোজ-উজ-জামানের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিকভাবে একাধিকবার আপত্তি জানালেও কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তার।

এ ঘটনার পর সজল লিখিতভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতেই নড়েচড়ে বসে বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা।

বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ একটি ১১ পৃষ্ঠার গোপনীয় তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে অভিযোগের সূত্রপাত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অভিযুক্তদের জবানবন্দি এবং অভিযোগকারীর বিস্তারিত দাবি তুলে ধরা হয়।

তদন্তে জান্নাতুল জেনান ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে ফিরোজ তার জবানবন্দিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে “সম্পূর্ণ অসত্য” বলে দাবি করেন।

তদন্তে উঠে আসে, এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু অনৈতিক সম্পর্ক নয়, রয়েছে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অভিযোগ। এর মধ্যে রয়েছে- অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অফিসে ইউনিফর্ম পরিধান না করা, সহকর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার, ডিউটি রোস্টার ও হজ পোস্টিং প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

বিশেষ করে জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮৪ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা উভয়ের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। বিমানের ভাবমূর্তি, নৈতিক মান ও সেবা-নিরপেক্ষতার চেতনারও পরিপন্থী হয়েছে উল্লেখ করে গত বছরের ২ নভেম্বর ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) মো. নওসাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফিরোজের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা ১৯৭৯-এর ৫৫ ধারার পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অন্যদিকে, গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানকে বিমান বাংলাদেশের যশোর কার্যালয়ে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে দুজনের বিরুদ্ধেই গত ৪ জানুয়ারি পৃথক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থায় দায়িত্বশীল পদে থেকে সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, সেই সূত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়ম- সব মিলিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এই ঘটনা নতুন করে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযুক্ত সাময়িক বরখাস্ত বিমান কর্মকর্তা ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে প্রতিবেদনটি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান; যা সম্পন্ন হলেই সরকারি নিয়ম মেনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। টিকিটের দাম ও যাত্রী সেবার মান নিয়ে সারাবছরই হরেকরকম আলোচনা হয় রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থা নিয়ে। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতির কৌশলও পরিবর্তন হয়েছে বিমানপাড়ায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

 

 

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

তদন্তে বেড়িয়ে এলো কোটি টাকার দুর্নীতি

বিমানের দুই কর্মকর্তার পরকীয়া নিয়ে রাস্তায় হাতাহাতি

সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর উত্তরায় প্রকাশ্যে মারধরের একটি সিটিটিভি ফ্যুটেজের জট খুলতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া বিমান কর্তৃপক্ষের। তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে বিমানের দুই কর্মকর্তার পরকীয়া প্রেমের ঘটনা। ওই দুই কর্মকর্তা কেবল পরকীয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; তারা দুজনে মিলে একটি সিন্ডিকেট করে বিমানের বেশ কিছু দাপ্তরিক অনিয়ম ও কোটি টাকা আত্নসাতেও জড়িয়ে পড়েন।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে, গত বছরের ৯ অক্টোবর দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি আবাসিক এলাকার সামনের একটি মারধরের ঘটনা থেকে। বাড়ির সিসি টিভি ফ্যুটেজে দেখা যায়, একটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছিলেন বিমানের জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার (জেজিএসও) ফিরোজ-উজ-জামান (পি-৩৬৫০৭)।

হঠাৎ দৌড়ে এসে তাকে গাড়ি থেকে টেনে নামান আরেক ব্যক্তি। মুহুর্তেই শুরু হয় মারধর। আশপাশে লোকজন জড়ো হলেও ফিরোজ কোনো প্রতিরোধ করেননি। নীরবে মার সহ্য করতে দেখা যায় তাকে।

ভিডিও কনটেন্ট দেখতে ক্লিক করুন https://www.facebook.com/share/v/1A6imJxvw2/

 

ঘটনার পর জানা যায়, হামলাকারী ব্যক্তি হলেন বিমান গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানের স্বামী সাহেদ মাহমুদ সজল। সজলের অভিযোগ, তার স্ত্রী জান্নাতুল জেনানের ((জি-৫৩০০৮) সঙ্গে সহকর্মী ফিরোজ-উজ-জামানের দীর্ঘদিনের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল।

যে বাড়ির সামনে এই হাতাহাতির ঘটনা ঘটে, সেখানেই জান্নাতুল জেনান তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। সজলের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাড়িতে ফিরোজ-উজ-জামানের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিকভাবে একাধিকবার আপত্তি জানালেও কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তার।

এ ঘটনার পর সজল লিখিতভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতেই নড়েচড়ে বসে বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা।

বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ একটি ১১ পৃষ্ঠার গোপনীয় তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে অভিযোগের সূত্রপাত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অভিযুক্তদের জবানবন্দি এবং অভিযোগকারীর বিস্তারিত দাবি তুলে ধরা হয়।

তদন্তে জান্নাতুল জেনান ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে ফিরোজ তার জবানবন্দিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে “সম্পূর্ণ অসত্য” বলে দাবি করেন।

তদন্তে উঠে আসে, এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু অনৈতিক সম্পর্ক নয়, রয়েছে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অভিযোগ। এর মধ্যে রয়েছে- অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অফিসে ইউনিফর্ম পরিধান না করা, সহকর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার, ডিউটি রোস্টার ও হজ পোস্টিং প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

বিশেষ করে জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮৪ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা উভয়ের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। বিমানের ভাবমূর্তি, নৈতিক মান ও সেবা-নিরপেক্ষতার চেতনারও পরিপন্থী হয়েছে উল্লেখ করে গত বছরের ২ নভেম্বর ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) মো. নওসাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফিরোজের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা ১৯৭৯-এর ৫৫ ধারার পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অন্যদিকে, গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানকে বিমান বাংলাদেশের যশোর কার্যালয়ে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে দুজনের বিরুদ্ধেই গত ৪ জানুয়ারি পৃথক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থায় দায়িত্বশীল পদে থেকে সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, সেই সূত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়ম- সব মিলিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এই ঘটনা নতুন করে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযুক্ত সাময়িক বরখাস্ত বিমান কর্মকর্তা ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে প্রতিবেদনটি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান; যা সম্পন্ন হলেই সরকারি নিয়ম মেনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। টিকিটের দাম ও যাত্রী সেবার মান নিয়ে সারাবছরই হরেকরকম আলোচনা হয় রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থা নিয়ে। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতির কৌশলও পরিবর্তন হয়েছে বিমানপাড়ায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।