ঢাকা ০৮:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিকিম কিভাবে স্বাধীনতা হারালো

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:২০:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৪
  • / 441

সিকিম

সিকিম। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি ছোট কিন্তু সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্য। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক সিকিমের শান্ত পরিবেশ এবং হিমালয়ান প্রকৃতিক মধ্যে সময় কাটাতে ভীড় করেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক স্বাধীন জাতির পরাধীন হওয়ার গল্প।

সিকিমের উত্তরে তিব্বত, পূর্বে ভুটান, পশ্চিমে নেপাল এবং দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে সিকিমের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট করা যায় যে, চারপাশেই ছিল ভিন্ন সাম্রাজ্য।

তিব্বত, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে অবিস্থিত এই পাহাড়ি রাজ্য তার কৌশলগত অবস্থানের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠেছিল ভারতে বৃটিশ শাসন শুরুর পুর্বে সিকিম তার পার্শ্ববর্তী নেপাল আর ভুটানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।

সিকিমের রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে ১৬৪২ সালে। সিকিমের প্রথম চোগিয়াল বা রাজা ছিলেন ফুন্টসোগ নামগিয়াল, যিনি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

অষ্টাদশ শতকে সিকিমের একটা পট পরিবর্তন হয়। সেটি হল নেপালের আক্রমণ। নেপালের গোর্খা সাম্রাজ্য হামলা চালায় এবং প্রায় ৪০ বছর সিকিমের বেশ কিছু এলাকা নেপালের দখলে থাকে। এই সময়ই বহু নেপালি সিকিমে বসবাস শুরু করে।

এই সময় আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাদের সঙ্গে শত্রু ছিল নেপালের। আর এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিকিমের সঙ্গে সু সম্পর্ক তৈরি করে। সময়টা ১৮১০।

১৮১৪-১৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নেপালে যুদ্ধ হয়, সেখানে নেপাল হেরে যায়। যুদ্ধে সহায়তার কারনে সিকিমের কাছে দার্জিলিং লীজের চুক্তি করে বৃটিশরা। কারণ সেখানে চা শিল্পের জমি ও হিল স্টেশন প্রয়োজন ছিল। এরপর বৃটিশদের প্রভাব ধীরে ধীরে সিকিমের রাজনীতিতে বাড়তে থাকে। তবে,স্বাধীনতা হারানোর প্রক্রিয়া তখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি।

ওই চুক্তির ফলে স্বাধীন সিকিমের রাজা, ধীরে ধীরে দার্জিলিং এ তার প্রভাব হারান। এলাকাটিতে নিজস্ব সেনা মোতায়েনের ক্ষমতাও ছিল না সিকিমের। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও, ১৯৫০ পর্যন্ত এই আইন বলবৎ ছিল।

তবে, স্বাধীনভারতের সরকার সিকিমকে তাদের প্রভাবের মধ্যে রাখতে চায়, কারণ সিকিমের কৌশলগত অবস্থান বিশেষত চীন এবং ভারতের মধ্যে একটি ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের সময় সিকিমের রাজা ছিলেন তাশি নামগিয়াল। তাঁর সঙ্গে ১৯৫০ সালে ইন্দো সিকিম ট্রিটি স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু।

এই সময়ই সিকিমের প্রথম  মুখ্যমন্ত্রী হন কাজি লেনডুপ দোরজি। এখানে রাজাও ছিল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও চালু হল। যদিও ক্ষমতার দিক থেকে রাজাই প্রধান। যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং বিদেশ নীতিতে অবশ্য ভারত সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল।

সিকিমের রাজা তাশি নামগিয়াল বিদেশ সফরে গেলে, সিকিমকে আলাদা স্বাধীন রাজ্য বলে তুলে ধরতো। এমনকী ভারতের পতাকাও ব্যবহার করতো না। বিদেশে সবসময়ই

প্রচার করতো সিকিম সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাষ্ট্র, যেন ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মতো। আর এই বিষয়টিই ভালো লাগেনি ভারত সরকারের।

১৯৬৩ সালে তাশি নামগিয়ালের মৃত্যু হয়, ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যু হয়। এই সময় সিকিমে ক্ষমতায় বসে তাশির ছেলে পালডেন থনডুপ নামগিয়াল।

পালডেন ক্ষমতায় বসার পরেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁর এক তিব্বতী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও, আর এক মার্কিনিকে বিয়ে করেন। নাম হোপ কুক। এই হোপ কুকের উপর অভিযোগ ওঠে, তিনি আসলে সিআইএ এজেন্ট।

১৯৭০-এর দশকে, চোগিয়ালদের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে শুরু করে। সিকিমের জনগণের একটি অংশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চায়।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগান। ১৯৭৩ সালে, সিকিমে গণআন্দোলন শুরু হয় এবং ভারতের হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়। ভারত এই সুযোগটি গ্রহণ করে এবং সিকিমে একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। এর পরের ঘটনাগুলি দ্রুত ঘটতে থাকে।

১৯৭৪ সালে সিকিম একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে, যা সিকিমকে ভারতের অধিভুক্ত একটি ‘সহযোগী রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে চোগিয়াল পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের এই প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে।

১৯৭৫ সালে, ভারতের সেনাবাহিনী সিকিমে প্রবেশ করে এবং চোগিয়াল প্যালেস ঘেরাও করে। সিকিমের সংসদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পাস করে এবং গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে সিকিম ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হবে।

১৯৭৫ সালের ১৬ মে সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। গণভোটে ৯৭ শতাংশ ভোটার এই অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভোট দেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিকিম তার স্বাধীনতা হারায় এবং ভারতের অংশ হয়ে যায়। সিকিমের রাজা চোগিয়াল তখন নির্বাসনে চলে যান।

এই ঘটনাটি অনেকের কাছে বিতর্কিত। চোগিয়ালের সমর্থকরা বলেন, ভারত সিকিমের অভ্যন্তরীণ সংকটকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক এই অন্তর্ভুক্তি করেছিল। অন্যদিকে, ভারতের সমর্থকরা মনে করেন, সিকিমের জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভারতের সঙ্গে
যুক্ত হওয়ার জন্য ভোট দিয়েছিলেন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সিকিম কিভাবে স্বাধীনতা হারালো

সর্বশেষ আপডেট ০৭:২০:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৪

সিকিম। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি ছোট কিন্তু সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্য। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক সিকিমের শান্ত পরিবেশ এবং হিমালয়ান প্রকৃতিক মধ্যে সময় কাটাতে ভীড় করেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক স্বাধীন জাতির পরাধীন হওয়ার গল্প।

সিকিমের উত্তরে তিব্বত, পূর্বে ভুটান, পশ্চিমে নেপাল এবং দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে সিকিমের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট করা যায় যে, চারপাশেই ছিল ভিন্ন সাম্রাজ্য।

তিব্বত, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে অবিস্থিত এই পাহাড়ি রাজ্য তার কৌশলগত অবস্থানের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠেছিল ভারতে বৃটিশ শাসন শুরুর পুর্বে সিকিম তার পার্শ্ববর্তী নেপাল আর ভুটানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।

সিকিমের রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে ১৬৪২ সালে। সিকিমের প্রথম চোগিয়াল বা রাজা ছিলেন ফুন্টসোগ নামগিয়াল, যিনি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

অষ্টাদশ শতকে সিকিমের একটা পট পরিবর্তন হয়। সেটি হল নেপালের আক্রমণ। নেপালের গোর্খা সাম্রাজ্য হামলা চালায় এবং প্রায় ৪০ বছর সিকিমের বেশ কিছু এলাকা নেপালের দখলে থাকে। এই সময়ই বহু নেপালি সিকিমে বসবাস শুরু করে।

এই সময় আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাদের সঙ্গে শত্রু ছিল নেপালের। আর এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিকিমের সঙ্গে সু সম্পর্ক তৈরি করে। সময়টা ১৮১০।

১৮১৪-১৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নেপালে যুদ্ধ হয়, সেখানে নেপাল হেরে যায়। যুদ্ধে সহায়তার কারনে সিকিমের কাছে দার্জিলিং লীজের চুক্তি করে বৃটিশরা। কারণ সেখানে চা শিল্পের জমি ও হিল স্টেশন প্রয়োজন ছিল। এরপর বৃটিশদের প্রভাব ধীরে ধীরে সিকিমের রাজনীতিতে বাড়তে থাকে। তবে,স্বাধীনতা হারানোর প্রক্রিয়া তখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি।

ওই চুক্তির ফলে স্বাধীন সিকিমের রাজা, ধীরে ধীরে দার্জিলিং এ তার প্রভাব হারান। এলাকাটিতে নিজস্ব সেনা মোতায়েনের ক্ষমতাও ছিল না সিকিমের। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও, ১৯৫০ পর্যন্ত এই আইন বলবৎ ছিল।

তবে, স্বাধীনভারতের সরকার সিকিমকে তাদের প্রভাবের মধ্যে রাখতে চায়, কারণ সিকিমের কৌশলগত অবস্থান বিশেষত চীন এবং ভারতের মধ্যে একটি ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের সময় সিকিমের রাজা ছিলেন তাশি নামগিয়াল। তাঁর সঙ্গে ১৯৫০ সালে ইন্দো সিকিম ট্রিটি স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু।

এই সময়ই সিকিমের প্রথম  মুখ্যমন্ত্রী হন কাজি লেনডুপ দোরজি। এখানে রাজাও ছিল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও চালু হল। যদিও ক্ষমতার দিক থেকে রাজাই প্রধান। যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং বিদেশ নীতিতে অবশ্য ভারত সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল।

সিকিমের রাজা তাশি নামগিয়াল বিদেশ সফরে গেলে, সিকিমকে আলাদা স্বাধীন রাজ্য বলে তুলে ধরতো। এমনকী ভারতের পতাকাও ব্যবহার করতো না। বিদেশে সবসময়ই

প্রচার করতো সিকিম সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাষ্ট্র, যেন ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মতো। আর এই বিষয়টিই ভালো লাগেনি ভারত সরকারের।

১৯৬৩ সালে তাশি নামগিয়ালের মৃত্যু হয়, ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যু হয়। এই সময় সিকিমে ক্ষমতায় বসে তাশির ছেলে পালডেন থনডুপ নামগিয়াল।

পালডেন ক্ষমতায় বসার পরেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁর এক তিব্বতী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও, আর এক মার্কিনিকে বিয়ে করেন। নাম হোপ কুক। এই হোপ কুকের উপর অভিযোগ ওঠে, তিনি আসলে সিআইএ এজেন্ট।

১৯৭০-এর দশকে, চোগিয়ালদের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে শুরু করে। সিকিমের জনগণের একটি অংশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চায়।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগান। ১৯৭৩ সালে, সিকিমে গণআন্দোলন শুরু হয় এবং ভারতের হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়। ভারত এই সুযোগটি গ্রহণ করে এবং সিকিমে একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। এর পরের ঘটনাগুলি দ্রুত ঘটতে থাকে।

১৯৭৪ সালে সিকিম একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে, যা সিকিমকে ভারতের অধিভুক্ত একটি ‘সহযোগী রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে চোগিয়াল পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের এই প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে।

১৯৭৫ সালে, ভারতের সেনাবাহিনী সিকিমে প্রবেশ করে এবং চোগিয়াল প্যালেস ঘেরাও করে। সিকিমের সংসদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পাস করে এবং গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে সিকিম ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হবে।

১৯৭৫ সালের ১৬ মে সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। গণভোটে ৯৭ শতাংশ ভোটার এই অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভোট দেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিকিম তার স্বাধীনতা হারায় এবং ভারতের অংশ হয়ে যায়। সিকিমের রাজা চোগিয়াল তখন নির্বাসনে চলে যান।

এই ঘটনাটি অনেকের কাছে বিতর্কিত। চোগিয়ালের সমর্থকরা বলেন, ভারত সিকিমের অভ্যন্তরীণ সংকটকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক এই অন্তর্ভুক্তি করেছিল। অন্যদিকে, ভারতের সমর্থকরা মনে করেন, সিকিমের জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভারতের সঙ্গে
যুক্ত হওয়ার জন্য ভোট দিয়েছিলেন।