শাহজাদপুর থেকে শিলিগুড়ি: এক বীরের যাত্রা
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১২:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 27
একাত্তরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রতনকান্দি গ্রামের দেবেশ চন্দ্র সান্যাল। একাত্তরের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তিনি তখন অষ্টম শ্রেনির ছাত্র। সেই বয়সেই দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।
কারণ পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে রাজধানী ঢাকায় বাঙালি সেনা, পুলিশ, ইপিআর, সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। এরপর ঢাকা ছাড়িয়ে সারা দেশে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী গণহত্যা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি চালিয়ে যায়। এ খবর রতনকান্দি গ্রামে পৌঁছুতে বেশি সময় লাগেনি । যা তার কৈশোর মনে নাড়া দেয়। এদিকে ১৭ এপ্রিল’ কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার ভবের পাড়ার বৈদ্যনাথ তলায় বাংলাদেশ এর অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়।
এরিমধ্যে তিনি লোকমুখে জানতে পারেন, দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্যে কিশোর-তরুণ-যুবকরা ভারতে যাচ্ছেন। তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিতে থাকেন। হঠাৎ বাচরা গ্রামের স্কুল ছাত্র আব্দুল ওহাবের সাথে তাঁর দেখা হয়। আব্দুল ওহাব তাঁর থেকে দুই শ্রেনি উপরে পড়ে। আব্দুল ওহাবের মাধ্যমে জানতে পারলেন, শাহজাদপুরের এমপিএ (আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য) মো. আব্দুর রহমান যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে নিয়ে যান। তিনিও এমপিএ মো. আব্দুর রহমান এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সেকথা বাবা মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখেন। দিন ঠিক হলো জুলাই মাসের কোনো একদিন। তিনি বাড়িতে কাউকে জানালেন না। তার স্বপ্ন পূরণের দিন এলো। রাত ১১টার দিকে এমপিএ মো. আব্দুর রহমান এর নেতৃত্বে নৌকাযোগে ২২ জন ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান দুজন গাইড। সকলের সাথে দুদিন পর তিনি শিলিগুড়ি পৌঁছান। ৭ নম্বর সেক্টরাধীন দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানি ঘাটা নামক ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ নেন।
প্রশিক্ষণের পর তাঁদেরকে পানি ঘাটা থেকে নিয়ে আসা হয় ৭ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার কালিয়াগঞ্জ থানার তরঙ্গপুরে। তরঙ্গপুরে আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গেরিলা গ্রুপ করা হয়। এই গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার হন সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার (বর্তমান উপজেলা) তামাই গ্রামের গাজী মো: আব্দুল মান্নান। দেবেশ চন্দ্র সান্যাল এর নামে বরাদ্দ করা হয় একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একটি হেলমেট, এক ম্যাগজিন ও এক বেল্ট গুলি । তাঁর কমান্ডারকে দেওয়া হয় গোলা বারুদ, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, পকেট মানি, রেশনিং এ্যালাউন্স এর টাকা ও অন্যান্যা সামগ্রী।
ছেলের কোনো খোঁজখবর না পেয়ে দেবেশের বাবা-মা পাগলের মতো হওয় যান। তাঁরা বাঁচার তাগিদে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতের আসামের মানিকারচর শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন।
দেশে ফিরেই কমান্ডার গাজী মো: আব্দুল মান্নান এর নেতৃত্বে একাত্তরের ২৪ অক্টোবর’ সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানা ও মুসলিমলীগ নেতা মোঃ আব্দুল মতিনের বাড়ি আক্রমণ করেন। সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি শেল্টারে কমান্ডার সহ যোদ্ধাদের যুদ্ধের নকশা বুঝিয়ে দেন। তার দলকে দুটি ভাগে ভাগ করে দেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কমান্ডার নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আক্রমন করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্রনাথ বাগ্চীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতা মো: আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমণ করে তাকে ধরে আনবে। দেবেশ চন্দ্র সান্যাল কমান্ডারের গ্রুপে থেকে থানা আক্রমণ যুদ্ধে অংশ নেন। রাত ৯ টায় বানিয়া গাতি শেল্টার থেকে যাত্রা করেন। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশ্যে ভাগ হয়ে যান। রাত ১২টায় একযোগে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা মোতাবেক তাদের গ্রুপ থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে স্ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলে । হুইসেল বাঁজিয়ে থানার সবাইকে জানিয়ে দেওয়ায় তাদেরকে লক্ষ্য করে সেন্ট্রি গুলি করে।
কমান্ডার এম.এ মান্নানের নেতৃত্বে বেলকুচি থানার কল্যাণপুরের একটি স্কুলে আশ্রয় নেন। ৫ নভেম্বর গ্রামের কয়েকজন নেতৃ স্থানীয় মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করেন। তারা সারারাত হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সকালের খাবার খেয়ে কমান্ডারের নির্দেশে পিটি, প্যারেড করেন। অস্ত্র পরিষ্কার করে ফুলথ্রু মারেন। দুজন করে ক্যাম্প পাহারার ডিউটি করেন। সেসময়ে অন্যান্যরা বিশ্রাম নেন। সকাল ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকিস্তানি হানাদার. মিলিশিয়া ও রাজাকার বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে আসছে।
দুইজন পাকিস্তানি দালাল গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছিল। তারা দূর থেকে অনুমান করেন, এই দলে ৫ পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও ৮ রাজাকার আছে। সাথে সাথে কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। া কমান্ডার এম.এ মান্নানের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা কল্যানপুর রাস্তার ধারে বাংকারের মত বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পজিশন নেন। বাঁশ ঝাড়ের সামনে রাস্তা ধরে পাকিস্তানি মিলিশিয়া, রাজাকার আসছিল। তাদের পথ দেখিয়ে আনছিল দুইজন। মুক্তিযোদ্ধাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে কমান্ডার কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করেন। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পার্শে¦ পজিশন নেও। ওরাও মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। দেবেশ চন্দ্র সান্যালও সহযোদ্ধাদের সাথে একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকেন। গোলাগুলির শব্দে আশ পাশের গ্রামে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা মো: নজরুল ইসলাম ও মো: বাবর আলীর গ্রুপ সহ কয়েকটি গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। এক ঘণ্টারও বেশি সময় সম্মুখ যুদ্ধ চলে। তারপর পাকিস্তানি হানাদারেরা পিছু হটে।
কিন্তু বিকাল ৩ টার দিকে এক ব্যক্তি দৌড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে কমান্ডার এম.এ মান্নানের কাছে এসে বললেন-“বেলকুচি থানা ও অন্যান্য জায়গা থেকে বেশ কিছু পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারেরা ভারী অস্ত্র নিয়ে আপনাদের কে আক্রমণ করার জন্য আসছে।’ সংবাদটি পেয়ে কমান্ডার সবাই কে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নিদের্শ দেন। কমান্ডারের নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন হয়ে দেবেশ চন্দ্র সান্যালসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা হেঁটে পিড়ার চর,খাসিয়ার চর ও অন্যান্য গ্রাম ঘুরে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মোঃ শামসুল হকের বাড়িতে শেল্টার নেন। পর দিন বেতকান্দি মিস্ত্রীবাড়ির ফাঁকা ভিটায় এসে কিছু সময় বিশ্রাম নেন। মো: কোরপ আলী মোল্লা নামক একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে তারা ফরিদ পাঙ্গাসী গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলহাজ¦ মো: আবু তালেব মাষ্টারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে শেল্টার নেন। প্রতিদিন রাতে কমান্ডার তাদের পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে অস্ত্রে ফুল থ্রু মারা হতো ও তেল দেওয়া হতো। প্রতিদিন পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করতে গ্রুপ করে রেকি করতেন।
এছাড়া তিনি সিরাজগঞ্জ সদর থানার কালিয়া হরিপুর ও জামতৈল রেলওয়ে ষ্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানের যুদ্ধে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ তুলে ধরে দেবেশ চন্দ্র সান্যাল বলেন, আমাদের গ্রুপ কমান্ডার গাজী মো: আব্দুল মান্নান ডেপুটি লিডার শাহজাদপুর থানার জামিরতা গ্রামের রবীন্দ্রনাথ বাগচীকে কমান্ডার করে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। আমাকে রবীন্দ্রনাথ বাগচীর গ্রুপে দেওয়া হয়। ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগচীর নেতৃত্বে একাত্তরের ১২ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর যুদ্ধে অংশ নেই । রাতে আমাদের শেল্টার নেই সৈয়দপুর গ্রামের কালা চক্রবর্ত্তী, আখর হাজী ও অন্যান্যের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর বেলা ১২ টার দিকে সংবাদ পাই পাকিস্তানি হানাদারেরা কৈজুরী হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারেরা পরাজিত হয়ে লঞ্চে যমুনা নদী পাড় হয়ে মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া ক্যাম্প থেকে রাস্তা চেনানোর জন্য দুই জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াপদা বাঁধ ধরে বেড়ার উদেশ্যে যাচ্ছিল। কৈজুরী থেকে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পিছু নিই। এই যুদ্ধে দুই জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় দুজন পথচারী গোলাগুলিতে শহিদ হন ।
ঐ দিনই শাহজাদপুর ও অন্যান্য স্থানের মুক্তিযোদ্ধারা শাহজাদপুর ও বাঘাবাড়ী ঘাট থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিতারিত করেন। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর শাহজাদপুর থানা হানাদারমুক্ত করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সহযোদ্ধারা। স্বাধীন দেশে অস্ত্র জমা দিয়ে আবার লেখাপড়ায় মনোযোগ দেন।



































