শব্দহীন যন্ত্রণা, অবহেলিত ১১ জনের প্রতিবন্ধী পরিবার
- সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৭:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
- / 151
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সাহানটি ইউনিয়নের পোল্ট্রিপাড়া গ্রাম। গ্রামটি পরিচিত তার সবুজ ও শান্ত পরিবেশের জন্য। এখানে প্রকৃতি হাসলেও একটি পরিবার যেন জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় চাপা পড়ে আছে। পোল্ট্রিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ ছিলেন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তিনি মারা গেছেন। তার পরিবারের মোট ১১ জন সদস্য বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। গ্রামের নাম পোল্ট্রিপাড়া হলেও বর্তমানে এটি পরিচিত বোবার গ্রাম নামে।
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। তিনি মারা গেলেও তার সংগ্রামের ধারা যেন থেমে নেই। মৃত্যুর সময় তিনি রেখে যান দুই ছেলে মো. মেরাজ উদ্দিন ও আব্দুস সাত্তার এবং তিন মেয়ে; ফুল বানু, তারা বানু ও জাহের বানু। তারা সবাই বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী।
তাদের ঘর থেকে আরও ছয় সন্তান বাকপ্রতিবন্ধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। সব মিলিয়ে একই পরিবারের ১১ জন সদস্য বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার মতো এক ভয়াবহ জীবন নিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই নিঃশব্দ কান্না যেন কারো কানে পৌঁছায় না।
অসহায় এই পরিবারটির জীবনযাপন সত্যিই বড় করুণ। তাদের থাকার জন্য নেই ভালো কোনো ঘর। জীর্ণ-শীর্ণ, ভাঙাচোরা দুটি টিনের ঘরে কোনোরকম ঠাসাঠাসি করে বাস করছেন তারা। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। শীতের দিনে বাতাস ও ঠাণ্ডায় তাদের শরীর কাঁপে। জীবনধারণের জন্য যতটুকু সুবিধা থাকা দরকার, তার কিছুই তাদের নেই।
স্থানীয় যুবক এমদাদুল হক জানান, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন অনেকটা শব্দহীন জগতের মতো। তাদের অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে থাকে বুকের গভীরে। পোল্ট্রিপাড়ার এই পরিবারটির দৈনন্দিন জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা নিজেদের মধ্যে ইশারা-ইঙ্গিত এবং সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তারা যেন এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু সেই ভাষার প্রতিটি ইঙ্গিতে লুকিয়ে আছে হাজারো না বলা কথা, হাজারো কষ্ট।
সরেজমিন দেখা যায়, তারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও চলাফেরার জন্য অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। ছোটখাটো কাজগুলো তারা নিজেরা করতে পারলেও যোগাযোগ এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য তাদের অনেক বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তারা তাদের প্রয়োজনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না, তাই প্রায়শই তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাগুলো অবহেলিত থাকে।
ওই বাড়ির সদস্য শাহ আলম কিরন জানান, এই পরিবারের ১১ জন প্রতিবন্ধী সদস্যের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব কার্যত পরিবারের বাক প্রতিবন্ধী পুরুষ সদস্যদের ওপর। পোল্ট্রিপাড়ার এই পরিবারের সদস্যরা অন্যের জমিতে কাজ করে, মানুষের খেত-খামারে কাজ করে কোনোরকম জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এতে যা আয় হয় তা দিয়ে ১১ জনের মুখে দুবেলা খাবার জোগানো প্রায় অসম্ভব। খেয়ে না খেয়েই তাদের দিন কাটে। তাদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে নিজেদের বা তাদের শিশুদের চিকিৎসা করানোর কথা ভাবতেও পারেন না। সামান্য অসুস্থতাও তাদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পোল্ট্রিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী বাবু মিয়া বলেন, “আমরা এই পরিবারটিকে অনেকদিন ধরে চিনি। তাদের কষ্ট নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ১১ জন প্রতিবন্ধী সদস্য নিয়ে কীভাবে তারা বেঁচে আছেন সেটা ভাবলে আমাদের বুক ফেটে যায়। প্রায়শই তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত। সরকারের পক্ষ থেকে যদি তাদের জন্য একটি স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে তারা হয়তো একটু ভালো থাকতে পারত।”
গ্রামের সত্তোরোর্ধ্ব আব্দুল হাকিম বলেন, “এই প্রতিবন্ধকতা যেন বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। প্রথমে সামাদ ভাই, এরপর তার সন্তানরা, এখন তাদের সন্তানরাও একই রোগে আক্রান্ত। আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু আমাদেরও আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাদের জন্য একটা ভালো ঘর, একটি পানির পাম্প আর নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলেও অনেক বড় উপকার হয়।”
আমেনা বেগম নামের এক নারী বলেন, “তারা কথা বলতে পারেন না, শুনতে পারেন না। একে অপরের সঙ্গে ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলেন। তবুও আমরা তাদের কষ্ট বুঝি; কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আমাদের তেমন কিছু করার নেই। তারা কাজ করতে পারেন, কিন্তু কাজ তো সব সময় পাওয়া যায় না। যদি সরকার তাদের জন্য কোনো স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা করে, তাহলে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, “পরিবারটির অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত। তাদের অসহায়ত্ব দেখে আমরা দুঃখিত। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের জন্য কিছু সহায়তার ব্যবস্থা করেছি। প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করেছি, টিসিবির কার্ড দিয়েছি। কিন্তু একই ঘরে এতগুলো প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এই সাহায্য যথেষ্ট নয়।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উপজেলা প্রশাসন এবং সমাজসেবা অফিস থেকে তাদের এখনো বড় কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। তারা চাইলে একটি স্থায়ী বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। আমরা সরকার ও বিত্তবানদের কাছে আশা করি, খুব দ্রুতই তাদের জন্য একটি সমাধান আসবে।”
গৌরীপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাহফুজ ইবনে আইয়ুব বলেন, “আমরা এই পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় এনেছি। তাদের বিশেষ চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের কিছু কর্মসূচি আছে, সেগুলো থেকেও তাদের সুবিধা দেওয়া হবে। তবে এই পরিবারের মতো বিশেষ ক্ষেত্রে আরও বড় ধরনের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য বিভাগ যেমন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আশা করছি, খুব দ্রুতই তাদের জন্য একটি স্থায়ী সমাধান বের হবে।”
তবে এ বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমিন পাপ্পার কার্যালয়ে গেলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রশ্ন করলে তিনি জানান, “উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ক্যামেরার সামনে কথা না বলতে মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র জারি করা আছে।”
পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসক মফিদুল আলমকে জানালে তিনি বলেন, “যারা বক্তব্য দিতে ভয় পায়, তারা মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশ মেনে চলে।”


































