লিবিয়ায় জিম্মিদশায় গৌরনদীর ৫৬ তরুণ
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫
- / 160
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ও বার্থী ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রামের পরিবারে এখন নেমে এসেছে দুঃসহ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এসব গ্রামের অন্তত ৫৬ তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন লিবিয়ায়, যারা সবাই বিদেশে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল ইউরোপে ভালো জীবনের, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে তারা লিবিয়ার মরুভূমি হয়ে পৌঁছেছেন এক অনিশ্চিত বন্দিদশায়। এসব তরুণদের ইতালি পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন দালাল প্রায় ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা নিয়েছে। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল বিক্রি করে, কেউ জমি বন্ধক রেখে বা গরু বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছে।
দালালরা প্রাথমিকভাবে তাদের সৌদি আরবে ওমরাহ ভিসায় পাঠায়, পরে ট্যুরিস্ট ভিসায় মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছায়। ২৫ বছরের নিচের অনেক তরুণকে পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার রুট দিয়ে। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় গোপন আস্তানায়, যেগুলোকে বলা হয় ‘রিসিভ হাউস’। সেখানে পৌঁছেই দিতে হয় পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম, এরপর অপেক্ষা শুরু হয় পরবর্তী কিস্তির—আরও ১০ থেকে ১৩ লাখ টাকা। এই টাকা পরিশোধের পর তাদের বলা হয় ‘গেইমে ওঠা’র সুযোগ মিলবে, যা আসলে প্রাণঘাতী সমুদ্রযাত্রা।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার আগে তরুণদের দেওয়া হয় সামান্য প্রশিক্ষণ—কিভাবে ঢেউ সামলাতে হবে, ওয়াকিটকি ব্যবহার করতে হবে, বা স্পিডবোট চালাতে হবে। প্রতিটি বোটে থাকে ৩২ থেকে ৩৮ জন যাত্রী, সঙ্গে তিনজন চালক, যারা একই সঙ্গে গাইডের কাজও করেন। খাবার হিসেবে থাকে শুকনো রুটি, খেজুর ও সামান্য পানি। কোমরে বাঁধা থাকে প্যাম্পার্স, যেন মাঝসাগরে টয়লেটের প্রয়োজনে কেউ সাগরে না পড়ে বা বিপদে না পড়ে।
গত ৮ ও ২২ সেপ্টেম্বর রাতে লিবিয়ার বেনগাজি উপকূল থেকে তিনটি স্পিডবোট রওনা দেয় ইতালির দিকে। বোটগুলোতে ছিলেন গৌরনদীর ৫৬ জন, আগৈলঝাড়ার ১০ জন এবং অন্যান্য জেলার আরও ৩৮ জন। কিন্তু ১৭ ঘণ্টা পর লিবিয়ার কোস্ট গার্ড বোটগুলো ঘিরে ফেলে এবং সবাইকে আটক করে। জানা গেছে, তাদের একটি দলকে নেওয়া হয় গাম্মুদা এলাকায়, আর প্রথম বোটের ৩৮ জনের এখনো কোনো খোঁজ নেই।
১০ অক্টোবর বন্দিদের পাঠানো একটি চিরকুটে লেখা ছিল, “আমরা গৌরনদীর ছেলে। দিনে একবার ৭০ গ্রাম খাবার দেওয়া হয়। পানির তীব্র সংকট। আমরা বাংকিনা কারাগারের পাশে এক গোডাউনে বন্দি। বাঁচাও মা।” চিরকুটটি গৌরনদীতে পৌঁছানোর পর এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোক আর ক্ষোভের ঢেউ।
এক তরুণ মেহেদী হাসান মুক্তি পান ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে। তার ভগ্নিপতি, ইতালিপ্রবাসী নোমান মাঝি, দালালদের মাধ্যমে টাকা পাঠান। পরে মেহেদী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা অন্য পরিবারের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে।
২১ সেপ্টেম্বর সকালে পশ্চিম ডুমুরিয়ায় জাকির মোল্লার বাড়ির সামনে নিখোঁজদের স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। তারা অভিযোগ করেন, জাকির মোল্লা ও তার সহযোগীরাই পুরো মানবপাচার চক্রের মূল হোতা। স্থানীয়রা জানান, মুক্তিপণের নামে আগেও টাকা নেওয়া হয়েছিল, এখন আবার নতুন করে প্রতারণা চলছে।
এই দালালচক্রের মূল ঘাঁটি শুধু গৌরনদীতেই নয়—লিবিয়ার বেনগাজি, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও মিসরেও তাদের সদস্যরা সক্রিয়। প্রতিটি ধাপে নেওয়া হচ্ছে আলাদা নামে টাকা—‘বোর্ডিং ফি’, ‘ম্যানেজ খরচ’, বা ‘কারাগার ছাড়ার ফি’।
খাঞ্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরু আলম সেরনিয়াবাত বলেন, “বহু তরুণ লিবিয়ায় আটক আছে, আমরা খবর পাচ্ছি। কিন্তু পরিবারগুলো মামলা করতে ভয় পাচ্ছে, কারণ করলে ওখানে থাকা আত্মীয়রা বিপদে পড়তে পারে।”
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম জানান, “মানবপাচার প্রতিরোধে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছি। ভুক্তভোগীদের তালিকা তৈরি হচ্ছে, সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই মুহূর্তে গৌরনদীর গ্রামগুলোতে একটাই প্রশ্ন—৫৬ তরুণের ভাগ্যে কী ঘটেছে? তারা কি ফিরে আসবেন, নাকি লিবিয়ার মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ে হারিয়ে যাবেন চিরতরে?

































