ঢাকা ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:২৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
  • / 107

বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে সরকারের কাছে একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গত ৯ অক্টোবর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদকে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের খসড়া তুলে ধরেন। চিঠির অনুলিপি অর্থ সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছেও পাঠানো হয়।

চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বের মর্যাদা বৃদ্ধি, পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন এবং গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় এই সংশোধনী খসড়া অনুমোদন করা হয় এবং তা অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ড. আহসান এইচ মনসুর চিঠিতে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাতে অতীতের ভুল ও অনিয়ম প্রতিরোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি হবে। তিনি মনে করেন, অতীতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এমন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু এখনই সংস্কারের উপযুক্ত সময় এবং এটি সরকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই প্রস্তাব আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদারের বিষয়টি অন্যতম শর্ত ছিল। আইএমএফ এ প্রস্তাব তৈরিতে কারিগরি সহায়তাও দিয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল, যা ইতোমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, এই চিঠির উদ্দেশ্য হলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি স্পষ্ট করা। তাঁর মতে, প্রস্তাবগুলো উচ্চাভিলাষী নয়; বরং অনেক আগেই এগুলো কার্যকর হওয়া উচিত ছিল এবং সরকার চাইলে সহজেই তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাবেক অর্থ বা পরিকল্পনামন্ত্রী/উপদেষ্টা কিংবা সাবেক গভর্নরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি, অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের অপসারণ সম্ভব হয়।

এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদে সরকার-নিযুক্ত পরিচালক সংখ্যা ৩ থেকে ১-এ নামিয়ে আনার এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৪ থেকে ৬-এ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা আরও জোরদার হবে। বর্তমানে পর্ষদে রয়েছেন গভর্নর, একজন ডেপুটি গভর্নর, তিনজন সচিব, দুজন অর্থনীতিবিদ ও একজন ব্যবসায়িক প্রতিনিধি।

গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণমন্ত্রীর সমান করার প্রস্তাবও করা হয়েছে, যা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব ও নীতি নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন আরও জোরদার হবে।

এ ছাড়া খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিরোধ, ক্রেডিট রেটিং সংস্থার তদারকি, জামানত মূল্যায়ন এবং আইনি যাচাইয়ের মতো নতুন ধারা। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও তথ্য গোপনের প্রবণতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে গভর্নরের স্বাধীন মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং কার্যকর নেতৃত্বের ওপর।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ

সর্বশেষ আপডেট ১০:২৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে সরকারের কাছে একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গত ৯ অক্টোবর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদকে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের খসড়া তুলে ধরেন। চিঠির অনুলিপি অর্থ সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছেও পাঠানো হয়।

চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বের মর্যাদা বৃদ্ধি, পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন এবং গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় এই সংশোধনী খসড়া অনুমোদন করা হয় এবং তা অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ড. আহসান এইচ মনসুর চিঠিতে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাতে অতীতের ভুল ও অনিয়ম প্রতিরোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি হবে। তিনি মনে করেন, অতীতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এমন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু এখনই সংস্কারের উপযুক্ত সময় এবং এটি সরকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই প্রস্তাব আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদারের বিষয়টি অন্যতম শর্ত ছিল। আইএমএফ এ প্রস্তাব তৈরিতে কারিগরি সহায়তাও দিয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল, যা ইতোমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, এই চিঠির উদ্দেশ্য হলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি স্পষ্ট করা। তাঁর মতে, প্রস্তাবগুলো উচ্চাভিলাষী নয়; বরং অনেক আগেই এগুলো কার্যকর হওয়া উচিত ছিল এবং সরকার চাইলে সহজেই তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাবেক অর্থ বা পরিকল্পনামন্ত্রী/উপদেষ্টা কিংবা সাবেক গভর্নরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি, অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের অপসারণ সম্ভব হয়।

এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদে সরকার-নিযুক্ত পরিচালক সংখ্যা ৩ থেকে ১-এ নামিয়ে আনার এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৪ থেকে ৬-এ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা আরও জোরদার হবে। বর্তমানে পর্ষদে রয়েছেন গভর্নর, একজন ডেপুটি গভর্নর, তিনজন সচিব, দুজন অর্থনীতিবিদ ও একজন ব্যবসায়িক প্রতিনিধি।

গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণমন্ত্রীর সমান করার প্রস্তাবও করা হয়েছে, যা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব ও নীতি নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন আরও জোরদার হবে।

এ ছাড়া খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিরোধ, ক্রেডিট রেটিং সংস্থার তদারকি, জামানত মূল্যায়ন এবং আইনি যাচাইয়ের মতো নতুন ধারা। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও তথ্য গোপনের প্রবণতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে গভর্নরের স্বাধীন মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং কার্যকর নেতৃত্বের ওপর।