ঢাকা ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:৩৬:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / 128

রংপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু

রংপুরে গত দুই মাসে অ্যানথ্রাক্সে অন্তত দুই শতাধিক গরু মারা গেছে। একই সময়ে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। স্থানীয়ভাবে অসচেতনতা এবং অসুস্থ পশু জবাইয়ের ঘটনাই এই সংক্রমণ বাড়িয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও পশুর টিকার সংকট দেখা দিয়েছে, যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ জন অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সে দুই জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অন্তত ৫০ জনের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়। আক্রান্ত পশুর মাংসের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এরপর ১৩–১৪ সেপ্টেম্বর আইইডিসিআরের একটি দল ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে, যার মধ্যে আট জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স পাওয়া যায়।

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক এম এ হালিম লাবলু জানান, ইমাদপুর ইউনিয়নের আমাইপুর গ্রামে একটি অসুস্থ গরু জবাই করার পর মাংস কাটাকাটির সময় পাঁচ–ছয় জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরীক্ষায় একজনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, “অ্যানথ্রাক্স গবাদিপশু থেকে মানুষে ছড়ায়, তবে মানুষ থেকে মানুষে নয়। তাই অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস খাওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, তিন উপজেলায় প্রায় ১২ লাখ গবাদিপশুর মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিনই কয়েকটি গরু মারা যাচ্ছে। দুই মাসে প্রাণহানির সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।

পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক বলেন, “শুধু পীরগাছাতেই দেড় লাখের মতো পশু আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার টিকা পেয়েছি, কিন্তু আরও ৫০ হাজারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। টিকা ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।”

মিঠাপুকুর ও কাউনিয়ায়ও একই অবস্থা। ৮০ হাজার টিকার বিপরীতে ২০ হাজার পাওয়া গেছে, যা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আক্রান্ত গরু অনেকেই কম দামে বিক্রি করেছেন। সেই মাংস গ্রামের মানুষ কিনে খেয়েছেন। কাটাকাটিতে অংশ নিয়েছেন নারীরা। এভাবেই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত পশু শনাক্ত করা কঠিন, তাই গরু-ছাগল জবাইয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে।”

অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যু হয়েছে পীরগাছার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক ও গৃহবধূ কমলা বেগমের। তারা আক্রান্ত গরুর মাংস কাটাকাটি ও রান্না করার সময় সংক্রমিত হন। এরপর থেকে এলাকায় একের পর এক আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল জানান, “অতিরিক্ত ৫০ হাজার টিকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছে।”

রংপুরের সিভিল সার্জন শাহিন সুলতানা বলেন, “তিন উপজেলায় মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। আক্রান্ত গরু জবাই না করতে স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত আছে, কোথাও সংকট হলে আমরা সরবরাহ করছি।”

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু ছাইদ জানান, “অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হওয়ার পর আগস্ট থেকেই টিকা কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলাতেও টিকা দেওয়া হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আক্রান্ত পশু জবাই না করা এবং মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা। জনসচেতনতা ও টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রংপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু

সর্বশেষ আপডেট ১০:৩৬:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

রংপুরে গত দুই মাসে অ্যানথ্রাক্সে অন্তত দুই শতাধিক গরু মারা গেছে। একই সময়ে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। স্থানীয়ভাবে অসচেতনতা এবং অসুস্থ পশু জবাইয়ের ঘটনাই এই সংক্রমণ বাড়িয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও পশুর টিকার সংকট দেখা দিয়েছে, যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ জন অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সে দুই জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অন্তত ৫০ জনের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়। আক্রান্ত পশুর মাংসের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এরপর ১৩–১৪ সেপ্টেম্বর আইইডিসিআরের একটি দল ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে, যার মধ্যে আট জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স পাওয়া যায়।

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক এম এ হালিম লাবলু জানান, ইমাদপুর ইউনিয়নের আমাইপুর গ্রামে একটি অসুস্থ গরু জবাই করার পর মাংস কাটাকাটির সময় পাঁচ–ছয় জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরীক্ষায় একজনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, “অ্যানথ্রাক্স গবাদিপশু থেকে মানুষে ছড়ায়, তবে মানুষ থেকে মানুষে নয়। তাই অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস খাওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, তিন উপজেলায় প্রায় ১২ লাখ গবাদিপশুর মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিনই কয়েকটি গরু মারা যাচ্ছে। দুই মাসে প্রাণহানির সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।

পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক বলেন, “শুধু পীরগাছাতেই দেড় লাখের মতো পশু আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার টিকা পেয়েছি, কিন্তু আরও ৫০ হাজারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। টিকা ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।”

মিঠাপুকুর ও কাউনিয়ায়ও একই অবস্থা। ৮০ হাজার টিকার বিপরীতে ২০ হাজার পাওয়া গেছে, যা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আক্রান্ত গরু অনেকেই কম দামে বিক্রি করেছেন। সেই মাংস গ্রামের মানুষ কিনে খেয়েছেন। কাটাকাটিতে অংশ নিয়েছেন নারীরা। এভাবেই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত পশু শনাক্ত করা কঠিন, তাই গরু-ছাগল জবাইয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে।”

অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যু হয়েছে পীরগাছার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক ও গৃহবধূ কমলা বেগমের। তারা আক্রান্ত গরুর মাংস কাটাকাটি ও রান্না করার সময় সংক্রমিত হন। এরপর থেকে এলাকায় একের পর এক আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল জানান, “অতিরিক্ত ৫০ হাজার টিকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছে।”

রংপুরের সিভিল সার্জন শাহিন সুলতানা বলেন, “তিন উপজেলায় মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। আক্রান্ত গরু জবাই না করতে স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত আছে, কোথাও সংকট হলে আমরা সরবরাহ করছি।”

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু ছাইদ জানান, “অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হওয়ার পর আগস্ট থেকেই টিকা কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলাতেও টিকা দেওয়া হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আক্রান্ত পশু জবাই না করা এবং মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা। জনসচেতনতা ও টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।