ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ক্ষমতার দ্বন্দ্বে স্থবির মনিপুর স্কুল

যৌন হয়রানির ঘটনায় বরখাস্ত শিক্ষককে নিয়ে গভর্নিং বডি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:১৯:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫
  • / 1825

অভিযুক্ত শিক্ষক খলিলুর রহমান

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নেতৃত্ব নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান গভর্নিং বডির আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। যেখানে ঠাঁই মিলেছে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে বরখাস্ত এক শিক্ষকও

খলিলুর রহমান নয়ন নামের ওই শিক্ষককে মাত্র দুই দিন আগে ২৮ এপ্রিল বরখাস্ত করা হয়। যিনি বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল এই শিক্ষককে।

অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরপরই রাজনৈতিক প্রভাবে বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন শিক্ষক খলিলুর রহমান। তবে তার এই ফিরে আসা মেনে নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তাকে স্থায়ীভাবে বহিস্কারের দাবি জানিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ। তারা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলন করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে বেশ চর্বিত চর্বণ হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

শিক্ষককে স্থায়ী বহিস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ধারাবাহিক আন্দোলন।
শিক্ষককে স্থায়ী বহিস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ধারাবাহিক আন্দোলন।

ধারাবাহিক ওই আন্দোলনের মুখে গত ২৮ এপ্রিল অভিযুক্ত শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তৎপরতায় মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে তিনি অধিক ক্ষমতা নিয়ে ফিরে এসেছেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে সাধারণ শিক্ষক সদস্য হিসেবে মো. খলিলুর রহমানকে নির্বাচন করে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ঘরানার শিক্ষক অধ্যাপক তাহমিনা আক্তারকে সভাপতি এবং প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষকে সদস্য সচিব করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন অভিযুক্ত ওই শিক্ষক।

এর আগে গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে কুক্ষিগত করে রাখা কামাল মজুমদার সিন্ডিকেট ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। এরপর গত ২ নভেম্বর ৬ মাসের জন্য নতুন একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন, প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাকালিন উদ্যোক্তা নূর মোহাম্মদের নাতি আবুল হাসান মো. নূরুল ইসলাম। যেখানে শিক্ষক প্রতিনিধি করা হয় মাসুম বিল্লাহ নামে এক শিক্ষককে।

৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি চিঠি
৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি চিঠি

এ বিষয়ে আবুল হাসান মো. নূরুল ইসলাম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, আর মাত্র দুই দিন পর নতুন কমিটি করতেই হতো। কিন্তু দুষ্ট চক্রটি সেটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হতে দিলো না। কেননা তাদের টার্গেটে ছিলাম আমি। আমি থাকায় তাদের স্বার্থ উদ্ধার হচ্ছিল না। তারা প্রতিষ্ঠানটির বিগত সময়ের অবৈধ নিয়োগ এবং লুটপাট জায়েজ করার জন্য চেয়ারে বসেছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। তারা চেষ্টা করেছিলো আমি যাতে অভিযোগ থেকে তাদের মুক্ত করে দেই। কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। আমাকে দূরে সরানোর জন্যই এতো কষ্ট।’

নিয়ম অনুযায়ি প্রধান শিক্ষক তিন জনের একটা তালিকা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দিবেন। সেখান থেকে বোর্ড মনোনয়ন দিবেন। কারন বোর্ড তো জানে না কে পরিচালনা করতে পারবেন। তাছাড়া যাকে সভাপতি করা হয়েছে (অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার) তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনভাবেই যুক্ত নন। তিনি কিভাবে এই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখবেন। তাকে রাজনৈতিকভাবে দেয়া হয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষককে কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নেয়া এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষক মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন। এই ঘটনায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারি পরিবারের শিক্ষার্থীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ওই শিক্ষক স্বপদে ফিরে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিতে আরো বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলছেন তারা।

বিদ্যমান গভর্নিং বডি বাতিলের বিষয়ে জানতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর মো. রিজাউল হকের সাথে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, তিনি রাজনীতির শিকার। বলেন- ‘অনেকেই মনে করেন আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। যেহেতু আমার দাঁড়ি নেই তাই আমাকে জামায়াত সমর্থক বানাতে পারছেন না। মূলত আমি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত না।’

‘বিগত সময়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে’ – যুক্ত করেন এই শিক্ষক।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে স্থবির মনিপুর স্কুল

যৌন হয়রানির ঘটনায় বরখাস্ত শিক্ষককে নিয়ে গভর্নিং বডি!

সর্বশেষ আপডেট ১০:১৯:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নেতৃত্ব নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান গভর্নিং বডির আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। যেখানে ঠাঁই মিলেছে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে বরখাস্ত এক শিক্ষকও

খলিলুর রহমান নয়ন নামের ওই শিক্ষককে মাত্র দুই দিন আগে ২৮ এপ্রিল বরখাস্ত করা হয়। যিনি বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল এই শিক্ষককে।

অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরপরই রাজনৈতিক প্রভাবে বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন শিক্ষক খলিলুর রহমান। তবে তার এই ফিরে আসা মেনে নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তাকে স্থায়ীভাবে বহিস্কারের দাবি জানিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ। তারা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলন করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে বেশ চর্বিত চর্বণ হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

শিক্ষককে স্থায়ী বহিস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ধারাবাহিক আন্দোলন।
শিক্ষককে স্থায়ী বহিস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ধারাবাহিক আন্দোলন।

ধারাবাহিক ওই আন্দোলনের মুখে গত ২৮ এপ্রিল অভিযুক্ত শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তৎপরতায় মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে তিনি অধিক ক্ষমতা নিয়ে ফিরে এসেছেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে সাধারণ শিক্ষক সদস্য হিসেবে মো. খলিলুর রহমানকে নির্বাচন করে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ঘরানার শিক্ষক অধ্যাপক তাহমিনা আক্তারকে সভাপতি এবং প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষকে সদস্য সচিব করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন অভিযুক্ত ওই শিক্ষক।

এর আগে গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে কুক্ষিগত করে রাখা কামাল মজুমদার সিন্ডিকেট ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। এরপর গত ২ নভেম্বর ৬ মাসের জন্য নতুন একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন, প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাকালিন উদ্যোক্তা নূর মোহাম্মদের নাতি আবুল হাসান মো. নূরুল ইসলাম। যেখানে শিক্ষক প্রতিনিধি করা হয় মাসুম বিল্লাহ নামে এক শিক্ষককে।

৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি চিঠি
৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি চিঠি

এ বিষয়ে আবুল হাসান মো. নূরুল ইসলাম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, আর মাত্র দুই দিন পর নতুন কমিটি করতেই হতো। কিন্তু দুষ্ট চক্রটি সেটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হতে দিলো না। কেননা তাদের টার্গেটে ছিলাম আমি। আমি থাকায় তাদের স্বার্থ উদ্ধার হচ্ছিল না। তারা প্রতিষ্ঠানটির বিগত সময়ের অবৈধ নিয়োগ এবং লুটপাট জায়েজ করার জন্য চেয়ারে বসেছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। তারা চেষ্টা করেছিলো আমি যাতে অভিযোগ থেকে তাদের মুক্ত করে দেই। কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। আমাকে দূরে সরানোর জন্যই এতো কষ্ট।’

নিয়ম অনুযায়ি প্রধান শিক্ষক তিন জনের একটা তালিকা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দিবেন। সেখান থেকে বোর্ড মনোনয়ন দিবেন। কারন বোর্ড তো জানে না কে পরিচালনা করতে পারবেন। তাছাড়া যাকে সভাপতি করা হয়েছে (অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার) তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনভাবেই যুক্ত নন। তিনি কিভাবে এই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখবেন। তাকে রাজনৈতিকভাবে দেয়া হয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষককে কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নেয়া এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষক মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন। এই ঘটনায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারি পরিবারের শিক্ষার্থীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ওই শিক্ষক স্বপদে ফিরে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিতে আরো বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলছেন তারা।

বিদ্যমান গভর্নিং বডি বাতিলের বিষয়ে জানতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর মো. রিজাউল হকের সাথে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, তিনি রাজনীতির শিকার। বলেন- ‘অনেকেই মনে করেন আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। যেহেতু আমার দাঁড়ি নেই তাই আমাকে জামায়াত সমর্থক বানাতে পারছেন না। মূলত আমি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত না।’

‘বিগত সময়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে’ – যুক্ত করেন এই শিক্ষক।