ঢাকা ০৪:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, কূটনৈতিক বিজয়ে বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ অগাস্ট ২০২৫
  • / 303

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও সফট কূটনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্য চুক্তিকে “ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয়” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার (১ আগস্ট) সকালে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী অর্জন এবং দেশটির কূটনৈতিক কৌশলের এক শক্তিশালী প্রকাশ।

ড. ইউনূস বলেন, “আমাদের শুল্ক আলোচক দল যে সফলতা দেখিয়েছে, তা এক কথায় অসাধারণ। ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের বিপরীতে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার যে সাফল্য, তা আমাদের কূটনৈতিক পরিণতিবোধ, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চতর সক্ষমতার প্রমাণ।”

তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া জটিল আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা শুল্ক, অশুল্ক বাধা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা বিষয় দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। এ অর্জন শুধু বর্তমান আর্থিক সুবিধা এনে দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সুযোগ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ও বাংলাদেশের অবস্থান
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যেখানে আগে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই ঘোষণার মাধ্যমে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেন, বিশেষ করে পোশাক খাতের ওপর।

বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, যার সিংহভাগই তৈরি পোশাক। গত বছর ওই খাতেই রপ্তানি হয়েছে ৭৩৪ কোটি ডলার। তাই হঠাৎ করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপে রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দেয়।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ তিন ধাপের আলোচনায় অংশ নেয়। ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস (ইউএসটিআর) বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানায় এবং জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আলোচনা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: বাংলাদেশের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: বাংলাদেশের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি

শুল্ক হ্রাস ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান
চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। তুলনামূলকভাবে ভারতের ওপর ২৫%, পাকিস্তানের ওপর ১৯%, মিয়ানমারের ওপর ৪০% এবং ভিয়েতনামের ওপর ২০% শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ শুল্ক হার এখনও অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে দেশটিকে।

এ অর্জনের ফলে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রেখেছে এবং নতুন রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

বোয়িং অর্ডার: আলোচনার কৌশলগত দিক
এই আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দেয়। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, এটি রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

তিনি বলেন, “বোয়িংয়ের সঙ্গে এই অর্ডার চুক্তি কূটনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল। এটি সরকারের পূর্ব-পরিকল্পিত উড়োজাহাজ বহর বৃদ্ধির লক্ষ্যেও সহায়ক হবে।” এর আগে বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং অর্ডার দিয়েছিল, যা এবার ২৫-এ উন্নীত করা হয়।

তবে সচিব একথাও স্পষ্ট করেন যে বোয়িং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকার এ সরবরাহ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক নয়। যাদের আগে অর্ডার, তারাই আগে সরবরাহ পাবে।

বাংলাদেশ রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ চুক্তির খসড়া পাওয়ার পরপরই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে, সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় বসে এবং ওয়াশিংটনে দুই দফা সরাসরি বৈঠক করে। এরপর ২৩ জুলাই চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। সেই অবস্থানের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়।

এই অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি এই চুক্তি ভবিষ্যতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বাজার প্রবেশাধিকারে সহায়ক হবে।

প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের ভাষায়, “আজকের সাফল্য আমাদের জাতির দৃঢ়তা ও উন্নয়নের সাহসী পথচলার প্রমাণ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, কূটনৈতিক বিজয়ে বাংলাদেশ

সর্বশেষ আপডেট ১১:০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ অগাস্ট ২০২৫

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্য চুক্তিকে “ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয়” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার (১ আগস্ট) সকালে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী অর্জন এবং দেশটির কূটনৈতিক কৌশলের এক শক্তিশালী প্রকাশ।

ড. ইউনূস বলেন, “আমাদের শুল্ক আলোচক দল যে সফলতা দেখিয়েছে, তা এক কথায় অসাধারণ। ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের বিপরীতে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার যে সাফল্য, তা আমাদের কূটনৈতিক পরিণতিবোধ, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চতর সক্ষমতার প্রমাণ।”

তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া জটিল আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা শুল্ক, অশুল্ক বাধা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা বিষয় দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। এ অর্জন শুধু বর্তমান আর্থিক সুবিধা এনে দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সুযোগ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ও বাংলাদেশের অবস্থান
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যেখানে আগে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই ঘোষণার মাধ্যমে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেন, বিশেষ করে পোশাক খাতের ওপর।

বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, যার সিংহভাগই তৈরি পোশাক। গত বছর ওই খাতেই রপ্তানি হয়েছে ৭৩৪ কোটি ডলার। তাই হঠাৎ করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপে রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দেয়।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ তিন ধাপের আলোচনায় অংশ নেয়। ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস (ইউএসটিআর) বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানায় এবং জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আলোচনা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: বাংলাদেশের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: বাংলাদেশের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি

শুল্ক হ্রাস ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান
চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। তুলনামূলকভাবে ভারতের ওপর ২৫%, পাকিস্তানের ওপর ১৯%, মিয়ানমারের ওপর ৪০% এবং ভিয়েতনামের ওপর ২০% শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ শুল্ক হার এখনও অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে দেশটিকে।

এ অর্জনের ফলে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রেখেছে এবং নতুন রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

বোয়িং অর্ডার: আলোচনার কৌশলগত দিক
এই আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দেয়। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, এটি রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

তিনি বলেন, “বোয়িংয়ের সঙ্গে এই অর্ডার চুক্তি কূটনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল। এটি সরকারের পূর্ব-পরিকল্পিত উড়োজাহাজ বহর বৃদ্ধির লক্ষ্যেও সহায়ক হবে।” এর আগে বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং অর্ডার দিয়েছিল, যা এবার ২৫-এ উন্নীত করা হয়।

তবে সচিব একথাও স্পষ্ট করেন যে বোয়িং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকার এ সরবরাহ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক নয়। যাদের আগে অর্ডার, তারাই আগে সরবরাহ পাবে।

বাংলাদেশ রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ চুক্তির খসড়া পাওয়ার পরপরই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে, সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় বসে এবং ওয়াশিংটনে দুই দফা সরাসরি বৈঠক করে। এরপর ২৩ জুলাই চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। সেই অবস্থানের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়।

এই অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি এই চুক্তি ভবিষ্যতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বাজার প্রবেশাধিকারে সহায়ক হবে।

প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের ভাষায়, “আজকের সাফল্য আমাদের জাতির দৃঢ়তা ও উন্নয়নের সাহসী পথচলার প্রমাণ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল।”