যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবৃদ্ধি: ভারতের টেক্সটাইল শিল্পে ধস
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৫৪:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 115
ভারতের বস্ত্রশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান খাত, আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে সেই সব চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ছবি: রয়টার্স
ভারতের টেক্সটাইল শিল্প দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। কৃষির পর এই খাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ঘটে। এই শিল্পের সাথে দেশটির প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে এই খাতে জড়িত।
দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদান প্রায় ২.৩ শতাংশ, শিল্প উৎপাদনের ১৩ শতাংশ এবং রপ্তানির ১২ শতাংশ। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর অভিঘাত ইতোমধ্যেই দেশটির প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে নেমে এসেছে।
পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়, ভারতের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল হাবে, কর্মরত পঙ্কজ কুমার নামের এক তরুণ শ্রমিক প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সুতার গিঁট বেঁধে কাজ করেন। মাসে প্রায় ১৮ হাজার টাকা উপার্জন করেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির কারণে তার আয়ের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। কারখানা ব্যবস্থাপক রাজেশ কুমার জানিয়েছেন, শুল্ক আরোপের পর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই অর্ডার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। নতুন কোনো অর্ডার না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে।
প্রতিবছর লুধিয়ানা থেকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের হোসিয়ারি ও নিটওয়্যার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক এই খাতের সঙ্গে জড়িত। ফলে শুল্কবৃদ্ধির প্রভাব এই অঞ্চলে বিশেষভাবে তীব্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ও টেক্সটাইল আমদানিকারক দেশ। ২০২৪ সালে ভারত প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে, যা ভারতের মোট পোশাক রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ। ফলে মার্কিন বাজারে ধাক্কা লাগা মানেই ভারতের টেক্সটাইল শিল্পে গভীর সংকট।
নাহার ইন্ডাস্ট্রিজের রপ্তানি প্রধান অশ্বিন অগ্রবাল জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান বছরে ৩৫-৪০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক মার্কিন ব্র্যান্ড যেমন GAP, Tommy Hilfiger ও PVH-কে সরবরাহ করে। কিন্তু শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো অর্ডার আসেনি। বরং বড় ব্র্যান্ডগুলো বিদ্যমান চুক্তি মেনে উৎপাদন শেষ করতে বললেও শর্ত হিসেবে শুল্কের প্রায় ২৫ শতাংশ ভার বহনের দাবি করছে। এতে ব্যবসার মার্জিন ভেঙে পড়ছে, টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোয় ভারত সর্বোচ্চ স্তরে ঠেকেছে- ৫০ শতাংশ। তুলনায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম ২০ শতাংশ, পাকিস্তান ১৯ শতাংশ এবং চীন ৩০ শতাংশ শুল্ক দিচ্ছে।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, ভারতের পণ্য এখন মার্কিন বাজারে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। আগে যখন ভারতের ওপর শুল্ক ছিল তুলনামূলক কম, তখন বাজার দখলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (CII) উত্তরাঞ্চলীয় রপ্তানি কমিটির চেয়ারম্যান অমিত থাপার বলেন, ‘এটি শুধু মুনাফার ক্ষতি নয়, বরং আমাদের প্রতিযোগিতা ও টিকে থাকার সামর্থ্যকেই আঘাত করছে।’
তার মতে, এমন শুল্কবৃদ্ধি অনেকটা ‘শাস্তি’ হিসেবেই দেখা দিচ্ছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা তৈরি করছে।
লুধিয়ানার পাশাপাশি ভারতের আরও অনেক টেক্সটাইল হাবও বিপর্যস্ত। তিরুপ্পুর (তামিলনাড়ু) দেশের ৬৮ শতাংশ নিটওয়্যার রপ্তানি এখান থেকে হয়। শুল্ক আরোপের আগে মার্কিন বাজারে চাহিদা বাড়ার আশায় উদ্যোক্তারা নতুন যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। কিন্তু এখন অর্ডার কার্যত স্থগিত।
তিরুপ্পুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক কুমার দুরাইসামি জানান, প্রাথমিকভাবে ২৫ শতাংশ শুল্কের বোঝা তারা মেনে নিলেও অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ আরোপের পর সব অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা দেউলিয়ার মুখে।
পানিপথ (হরিয়ানা); বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল রিসাইক্লিং হাব এবং ভারতের প্রধান কার্পেট, কম্বল ও হোম টেক্সটাইল সরবরাহকারী অঞ্চল। বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার, যার ৬০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। শুল্ক বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য নতুন অর্ডার বাতিল হয়েছে।
শিল্পপতি রাকেশ কুমার গয়াল বলেন, “আমরা মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে নতুন করে কথা বলছিলাম। কিন্তু এখন সব পরিকল্পনা থমকে গেছে।”
সুরাত, বিকানের ও কোয়েম্বাটুর; এ শহরগুলোও রপ্তানিনির্ভর। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষুদ্র ইউনিটে উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে।

শিল্পপতিরা এখন নতুন কৌশলের সন্ধান করছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো দেশে গুদাম স্থাপন করে সামান্য ভ্যালু অ্যাডিশন করে পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। এতে কার্যত ভারতের উৎপাদনের একটি অংশ অন্য দেশে চলে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের টেক্সটাইল খাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
হরিয়ানা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি বিনোদ ধামীজা জানান, অনেক রপ্তানিকারক ইতোমধ্যেই এ ধরনের বিকল্প নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। তবে এতে খরচ বাড়বে এবং প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
এই শিল্পে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ করেন, বিশেষ করে ঘরভিত্তিক ক্ষুদ্র উৎপাদন ইউনিটে। তিরুপ্পুরে কাজ করা এক এনজিও কর্মী মেরি অনুকলাথাম জানান, অনেক নারী দিনে এক ডলারেরও কম আয় করেন। যদি অর্ডার স্থবির হয়ে যায়, তবে তাদের আয় একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে।
ভারতের টেক্সটাইল শিল্প এখন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি শুল্ক কমায় না, তবে ভারতের বাজার হারানোর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়বে। এতে শুধু শিল্পপতি নয়, কোটি কোটি শ্রমিকের জীবিকা বিপন্ন হবে।
অমিত থাপার সতর্ক করে বলেন, ‘লাভ রক্ষা করা না হোক, অন্তত শ্রমিকদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’ নইলে দেশজুড়ে ছাঁটাইয়ের ঢেউ নেমে আসবে।
ভারতের টেক্সটাইল শিল্প একদিকে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি, অন্যদিকে কোটি মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কবৃদ্ধি এ খাতকে অভূতপূর্ব চাপে ফেলেছে। বাজার হারানোর আতঙ্ক, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া, নারী শ্রমিকদের আয় অনিশ্চয়তা এবং নতুন কৌশল খোঁজার তাড়না- সব মিলিয়ে শিল্পখাতটি এখন টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সমাধান এবং অভ্যন্তরীণভাবে শ্রমিকসহায়তা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা




































