যমুনার পর পদ্মা-মেঘনাতেও ডিজেল ঘাটতি
- সর্বশেষ আপডেট ১২:২৫:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 58
যমুনা অয়েল কোম্পানিতে ডিজেল ঘাটতির পর এবার একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে পদ্মা ও মেঘনা তেল কোম্পানিতেও। এই দুই প্রতিষ্ঠানের নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে সরবরাহ করা ডিজেলের প্রায় দেড় লাখ লিটার হিসাব মিলছে না। চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইন দিয়ে তেল আসার পর ডিপোতে মেপে পরিমাণ কম পাওয়া যাচ্ছে। মিটার ত্রুটি, ট্যাংকের ধারণক্ষমতা বা তাপমাত্রাজনিত কারণে এই ঘাটতি হচ্ছে কি না-তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খবর প্রথম আলোর।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের একমাত্র সরকারি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী সংস্থা। বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানি বাজারে জ্বালানি তেল বিতরণ করে থাকে। বিপিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন পাইপলাইন ব্যবস্থায় সরবরাহ শুরু হওয়ার পর থেকেই ডিজেল ঘাটতির এই তথ্য উঠে আসে।
ডিপোতে যারা কাজ করেন, তারা জানান-এখনো পর্যন্ত তেল মাপা হয় পুরোনো ‘ডিপ স্টিক’ পদ্ধতিতে। ট্যাংকের গভীরতা মাত্র দুই মিলিমিটার কম দেখালেই প্রায় ১,২০০ লিটার তেল চুরি করা সম্ভব। আগে যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপোতে ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ভুলভাবে উল্লেখ থাকার কারণে পরিমাপে সমস্যা ধরা পড়েছিল। এবার পদ্মা ও মেঘনার ট্যাংকগুলোর সক্ষমতাও নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান জানান, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই ঘাটতির কারণ নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। দুই প্রান্তের মিটার, ট্যাংকের ডিজাইন অথবা শীতের কারণে তেলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ফলে পরিমাপ কম পাওয়া যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৭২৪ লিটার ডিজেল পাঠানো হয় মেঘনার ডিপোতে। ডিপোতে মাপা হয় ২৪ লাখ ২২ হাজার ৪৭৩ লিটার—অর্থাৎ ঘাটতি ১ লাখ ১৫ হাজার ২৫১ লিটার।
১১ নভেম্বর পদ্মার ডিপোতে সরবরাহ করা ২৫ লাখ ২০ হাজার ৭৭০ লিটার ডিজেলের বিপরীতে পাওয়া যায় ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬৮ লিটার—ঘাটতি ২৭ হাজার ৩০২ লিটার।
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, পাইপলাইনের দুই পাশে থাকা মিটারের হিসাবে বরং প্রায় ১,৮০০ লিটার তেল বেশি পাওয়া গেছে। তাপমাত্রা কম থাকায় ট্যাংকে পরিমাপ করতে গিয়ে কম দেখাতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৬ সালে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তিন দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ব্যয়ও ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পাইপলাইন পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয় ‘পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসি’। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান জানান, প্রকল্পটি এখনও হস্তান্তর হয়নি; মিটারগুলোর সঠিকতা যাচাইয়ের পরই পূর্ণমাত্রায় বিপণন কোম্পানির কাছে সরবরাহ দায়িত্ব যাবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল হক বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল গায়েব হওয়ার সুযোগ নেই। পদ্মা ও মেঘনার হিসাব-অমিল কোথাও না কোথাও ধরা পড়বে। মিটার রক্ষণাবেক্ষণ ও ট্যাংকের ধারণক্ষমতা যাচাই শেষে সবকিছু পরিষ্কার হবে। এসব সম্পন্ন করতে আরও দুই মাস লাগতে পারে।
আগে যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় চার লাখ লিটার ডিজেল ঘাটতির অভিযোগ ওঠে। তদন্তে দেখা যায়-ডিপোর দুটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা আগের তুলনায় ৭৭ হাজার ৪৯২ লিটার বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ট্যাংকের সক্ষমতা ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, দেশে জাহাজ থেকে শুরু করে পেট্রলপাম্প পর্যন্ত তেল চুরির ইতিহাস রয়েছে। সেই চুরি ঠেকাতে পাইপলাইন নির্মাণ করা হলেও এখনো তেল হারিয়ে যাচ্ছে-এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, ট্যাংকের সক্ষমতা কমিয়ে দেখানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি। তিনি সুপারিশ করেন, নিরপেক্ষ নাগরিক বা আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
এ বিষয়ে গত মাসে জ্বালানি সচিবের সভাপতিত্বে বিপিসির সভায় শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব কমানো, নিয়মিত নজরদারি ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি তেল চুরির নানা অভিযোগ পর্যালোচনায় একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়।
































