ঢাকা ১০:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মানবতার মৃত্যু কোথায়? গাজায় ক্ষুধা আর ধ্বংসের ছায়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
  • / 115

গাজায় মানবতার মৃত্যু

গাজায় বসবাসরত প্রতিটি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন এখন নিয়মিতভাবে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। এ সংকটময় পরিস্থিতিতে অপুষ্টির কারণে মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে; প্রায় ৯০ হাজার নারী ও শিশু এখন অপুষ্টিজনিত জরুরি সহায়তার অপেক্ষায়।

গত সপ্তাহেই গাজায় অপুষ্টিজনিত কারণে ৯ জন মারা গেছেন বলে জানায় হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২২ জনে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় খাদ্য সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর মানবিক নীতিবিরোধী অবরোধের অভিযোগ তুলেছে।

সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না, মানবিক বিপর্যয় গভীরতর

গাজায় যেকোনো ধরনের পণ্য সরবরাহের ওপর ইসরায়েল কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যদিও ইসরায়েল বলছে তারা মানবিক সহায়তা আটকে রাখছে না, বাস্তবে সহায়তা প্রবেশের বাধা ক্রমেই বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান এ অবস্থায় আকাশপথে সাহায্য পাঠাতে চাইলেও ইসরায়েলের অনুমতি এখনও মেলেনি।

জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গাজার মানবিক বিপর্যয়ের অবসান প্রয়োজন এবং সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এ অবস্থায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “মানবতা ও সত্যের এমন অভাব আমি ব্যাখ্যা করতে পারছি না।”

বিতর্কিত ত্রাণব্যবস্থা ও সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ )’ গত মে থেকে গাজায় সহায়তা বিতরণ করছে। তবে এর কার্যক্রম নিয়ে জোর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জিএইচএফ’র হয়ে কাজ করা সাবেক এক মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদার বিবিসিকে জানান, তিনি সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি মর্টার, কামান, গুলিবর্ষণ এবং ট্যাংকের গোলা ব্যবহার করতে দেখেছেন আইডিএফ ও মার্কিন ঠিকাদারদের দ্বারা।

এই সাবেক সেনা সদস্য অ্যান্থনি অ্যাগুইলার বলেন, “আমার পুরো সামরিক জীবনে আমি এত অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা ও বলপ্রয়োগ কখনো দেখিনি।” জিএইচএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগেই অসদাচরণের দায়ে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনিশ্চয়তায়

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল কাতার থেকে ফিরে যাওয়ার ফলে নতুন করে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের আলোচনা থমকে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামাস চুক্তিতে আগ্রহী নয় এবং তাদের মানসিকতাই ধ্বংসাত্মক।

হামাস বলছে, তারা এখনো আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং কাতারে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে ইসরায়েল এখনও চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত জানায়নি।

গাজা: বারবার বাস্তুচ্যুতি ও সম্পূর্ণ ধ্বংস

গাজায় গত ৯ মাসের সংঘাতে ৫৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব। চলমান যুদ্ধ, অবরোধ, এবং অব্যাহত বিমান হামলায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই কয়েকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মার্চ মাসে ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পরে কিছুটা শিথিল হলেও, খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট আরও বাড়ে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছে তারা সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। এর প্রতিবাদে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের শতাধিক এমপি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি একই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে স্টারমার বলেছেন, এটি আরও বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনায় আনতে হবে।

এই মুহূর্তে গাজার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই ভয়াবহ ও অমানবিক এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ালেও কার্যত বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ, অবরোধ এবং সহায়তা ব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণ, সব মিলিয়ে গাজা যেন এক অন্ধকার গহ্বরে ধ্বংস, অনাহার আর মৃত্যু নিয়ে আটকে আছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মানবতার মৃত্যু কোথায়? গাজায় ক্ষুধা আর ধ্বংসের ছায়া

সর্বশেষ আপডেট ১১:০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

গাজায় বসবাসরত প্রতিটি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন এখন নিয়মিতভাবে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। এ সংকটময় পরিস্থিতিতে অপুষ্টির কারণে মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে; প্রায় ৯০ হাজার নারী ও শিশু এখন অপুষ্টিজনিত জরুরি সহায়তার অপেক্ষায়।

গত সপ্তাহেই গাজায় অপুষ্টিজনিত কারণে ৯ জন মারা গেছেন বলে জানায় হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২২ জনে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় খাদ্য সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর মানবিক নীতিবিরোধী অবরোধের অভিযোগ তুলেছে।

সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না, মানবিক বিপর্যয় গভীরতর

গাজায় যেকোনো ধরনের পণ্য সরবরাহের ওপর ইসরায়েল কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যদিও ইসরায়েল বলছে তারা মানবিক সহায়তা আটকে রাখছে না, বাস্তবে সহায়তা প্রবেশের বাধা ক্রমেই বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান এ অবস্থায় আকাশপথে সাহায্য পাঠাতে চাইলেও ইসরায়েলের অনুমতি এখনও মেলেনি।

জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গাজার মানবিক বিপর্যয়ের অবসান প্রয়োজন এবং সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এ অবস্থায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “মানবতা ও সত্যের এমন অভাব আমি ব্যাখ্যা করতে পারছি না।”

বিতর্কিত ত্রাণব্যবস্থা ও সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ )’ গত মে থেকে গাজায় সহায়তা বিতরণ করছে। তবে এর কার্যক্রম নিয়ে জোর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জিএইচএফ’র হয়ে কাজ করা সাবেক এক মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদার বিবিসিকে জানান, তিনি সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি মর্টার, কামান, গুলিবর্ষণ এবং ট্যাংকের গোলা ব্যবহার করতে দেখেছেন আইডিএফ ও মার্কিন ঠিকাদারদের দ্বারা।

এই সাবেক সেনা সদস্য অ্যান্থনি অ্যাগুইলার বলেন, “আমার পুরো সামরিক জীবনে আমি এত অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা ও বলপ্রয়োগ কখনো দেখিনি।” জিএইচএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগেই অসদাচরণের দায়ে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনিশ্চয়তায়

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল কাতার থেকে ফিরে যাওয়ার ফলে নতুন করে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের আলোচনা থমকে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামাস চুক্তিতে আগ্রহী নয় এবং তাদের মানসিকতাই ধ্বংসাত্মক।

হামাস বলছে, তারা এখনো আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং কাতারে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে ইসরায়েল এখনও চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত জানায়নি।

গাজা: বারবার বাস্তুচ্যুতি ও সম্পূর্ণ ধ্বংস

গাজায় গত ৯ মাসের সংঘাতে ৫৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব। চলমান যুদ্ধ, অবরোধ, এবং অব্যাহত বিমান হামলায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই কয়েকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মার্চ মাসে ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পরে কিছুটা শিথিল হলেও, খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট আরও বাড়ে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছে তারা সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। এর প্রতিবাদে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের শতাধিক এমপি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি একই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে স্টারমার বলেছেন, এটি আরও বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনায় আনতে হবে।

এই মুহূর্তে গাজার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই ভয়াবহ ও অমানবিক এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ালেও কার্যত বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ, অবরোধ এবং সহায়তা ব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণ, সব মিলিয়ে গাজা যেন এক অন্ধকার গহ্বরে ধ্বংস, অনাহার আর মৃত্যু নিয়ে আটকে আছে।