মহাপিণ্ড দানের আলোয় ভোরের বান্দরবান শহর
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:২৯:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
- / 106
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই বান্দরবানের রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারের চারপাশে যেন এক শান্ত নীরবতা নেমে আসে। বাতাসে ধূপের সুবাস, অর্ধেক জ্বলা প্রদীপের আলো এবং মানুষের ক্ষীণ পদচারণার শব্দে পরিবেশ আরও মনোহর হয়ে ওঠে। সারি সারি সাদা ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা নারী-পুরুষ, হাতে ফল, ফুল, ভাত, মিষ্টান্ন ও অন্যান্য উপকরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আজ মহাপিণ্ড দানের দিন, যা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি গভীর ধর্মীয় ও আত্মিক অনুশীলনের অংশ। বর্ষাবাস শেষে সন্ন্যাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর এই অনুষ্ঠান পালিত হয়।
বান্দরবানের রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। পাহাড়ি পোশাক পরা নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণ সকলেই সমান উদ্দীপনায় অংশ নেন। এই মহাপিণ্ড দানের মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদান করা হয়। পুরো এলাকা জুড়ে শতাধিক ভক্ত সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করেন।
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে ওঠে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বৌদ্ধ বিহার থেকে বের হয়ে সড়ক ধরে প্রদক্ষিণ শুরু করেন। ভক্তরা একে একে দান করেন—কেউ ভাত, কেউ ফল, কেউ পোশাক, কেউ আবার শুধু একটি ফুল। এই দানের মূল উদ্দেশ্য বস্তুগত নয়, বরং হৃদয়ের পবিত্রতা। যুগ যুগ ধরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।
প্রায় তিন শতাধিক বৌদ্ধ ভিক্ষু ভোরে সমবেত হন। পিন্ডদান অনুষ্ঠানে শিষ্যদের সঙ্গে তারা ভিক্ষুদের বিভিন্ন সামগ্রী গ্রহণ করতে দেন। ঢাক-ঢোলের তালে এলাকাজুড়ে প্রদক্ষিণ করা হয়, জাদীপাড়া, রাজারমাঠ, মধ্যমপাড়া, মগ বাজার ও উজানী পাড়া সহ সব অলিগলিতে দান করা হয়। কেউ চাল, কেউ অর্থ বা ফলমূল দান করেন, কেউ বিভিন্ন সামগ্রী দেন। এই দানের মাধ্যমে মানুষ লোভ, হিংসা ও অহংকার থেকে মুক্তি পান। মহাপিণ্ড দান সম্পন্ন হয় গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে।
মহাপিণ্ড দানের অংশ হিসেবে হ্লাসিং হাই, নিনিপ্রু, উমেছাইসহ অনেক ভক্ত কলম, খাতা, চাউল, অর্থ ও অন্যান্য সামর্থ্য অনুযায়ী দান করেন। তাদের প্রত্যাশা, এই দানের মাধ্যমে পরিবারে সুখ-শান্তি ফিরে আসুক এবং পাহাড়ের শান্তি বজায় থাকুক। পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘের সহ-সভাপতি ও রাজবিলা বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ক্ষ্রেমা চাহ্রা মহাথেরো বলেন, মহাপিণ্ড দান শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং শান্তি, সদ্ভাব ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। এই দানের মাধ্যমে দেশের শান্তি ফিরে আসুক—এটাই ভক্তদের প্রত্যাশা।


































