বর্ষা–মাহিরের প্রেমের বলি জবি ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ
- সর্বশেষ আপডেট ১০:১৩:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
- / 125
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসাইনের হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের প্রেমিক মাহির রহমান ও তার বন্ধু মিলে প্রেমঘটিত দ্বন্দ্বের জেরে জোবায়েদকে হত্যা করেছে। ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ছাত্রী, বার্জিস শাবনাম বর্ষা, যিনি পুলিশের কাছে জানিয়েছেন—তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানতেন না।
সোমবার (২০ অক্টোবর) সকালে বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, বর্ষা ও মাহিরের নয় বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা দুজনই পুরান ঢাকার বাসিন্দা; মাহির পড়তেন বুরহান উদ্দিন কলেজে, আর বর্ষা পড়তেন ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে। ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বর্ষা তার প্রেমিক মাহিরকে জানান যে তিনি এখন অন্য একজন—জোবায়েদ হোসাইনকে পছন্দ করেন। এ খবর জানার পর ক্ষুব্ধ হয়ে মাহির তার বন্ধুকে নিয়ে জোবায়েদকে হত্যা করে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
ওসি জানান, বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না এবং তাদের মাঝে এমন কোনো মেসেজও পাওয়া যায়নি যা ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়। তবু বর্ষার ওই স্বীকারোক্তির কারণে মাহির ক্ষিপ্ত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, বর্ষার সঙ্গে জোবায়েদের বন্ধু সৈকতের পরিচয় হয় ফেসবুকে। তাদের যোগাযোগ সীমিত ছিল, এবং ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্কের প্রমাণ মেলেনি। জোবায়েদ নিহত হওয়ার পর বর্ষা সৈকতকে মেসেজ দিয়ে ঘটনাটি জানান।
ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো উদ্বেগ, কান্না বা নার্ভাসনেস দেখা যায়নি। তিনি পুরো সময়টাই শান্ত ছিলেন।” তিনি আরও জানান, ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য পুলিশ আরও গভীর তদন্ত চালাচ্ছে।
জোবায়েদ হোসাইন ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য ছিলেন। তিনি এক বছর ধরে পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নূরবক্স লেনের রৌশান ভিলা নামের বাসায় টিউশনি করতেন। বর্ষা নামে এক ছাত্রীকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়াতেন তিনি। রবিবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে ওই ছাত্রীদের বাসার তিনতলায় তাকে খুন করা হয়। সিঁড়ি থেকে তিনতলা পর্যন্ত রক্তের দাগ পাওয়া যায় এবং তার মরদেহ তিনতলার সিঁড়িতে উপুড় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হত্যার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বংশাল থানার সামনে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করে রাখেন। পুলিশ রাত ১১টার দিকে ছাত্রী বর্ষাকে হেফাজতে নেয়। পরে তাকে পুলিশি প্রটোকলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১০টা ৫০ মিনিটে নিহত জোবায়েদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হত্যার ১৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তখনও মামলা হয়নি বলে অভিযোগ করেন নিহতের পরিবার। তারা জানায়, রোববার রাত ১টা থেকে মামলা করার চেষ্টা করলেও সোমবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত কোনো মামলা গ্রহণ করেনি বংশাল থানা। পরিবারের দাবি, তারা ছাত্রী বর্ষা, তার বাবা-মা, প্রেমিক মাহির রহমান ও তার বন্ধু নাফিসসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দিতে চাইলেও ওসি রফিকুল ইসলাম এতজনের নামে মামলা না করার পরামর্শ দেন।
নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত জানান, “ওসি বলেছেন, মেয়ের বাবা-মার নাম দিলে মামলাটা নাকি দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা ন্যায়বিচার চাই, তাই তাদের নাম বাদ দিতে রাজি নই।”
পরিবারের সদস্যরা সাত ঘণ্টারও বেশি সময় থানায় অপেক্ষা করেও মামলা করতে পারেননি। ওসি তখন উপস্থিত না থাকায় বিলম্ব হয় বলে জানা যায়। পরে ওসি এসে আবারও মামলায় আসামির সংখ্যা কমানোর পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “তারা যাদের নাম দিতে চায় দিতে পারে, তবে আমরা পরামর্শ দিয়েছি—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে।”
বর্তমানে পুলিশ মূল আসামি মাহির রহমান ও তার বন্ধুকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে।
































