ববিতে কাশফুলের সৌন্দর্যের আড়ালে অনুন্নয়ন
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪১:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
- / 110
দক্ষিণবঙ্গের মনোমুগ্ধকর নদী কীর্তনখোলার তীরে গড়ে ওঠা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) শরতের কাশফুলে সেজেছে নতুন রূপে। লাল ইটের দালানের প্রান্তে প্রান্তে সাদা কাশফুল বাতাসে দোল খাচ্ছে—দেখলে মনে হয়, যেন মেঘের দল নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ একর জমিনে। মাঠজুড়ে দুলছে কাশফুলের ঢেউ, যেখানে শিক্ষার্থী, স্থানীয় মানুষ ও দূর থেকে আগত দর্শনার্থীরা কেউ ছবি তুলছেন, কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই মনোরম দৃশ্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক যুগের বেশি সময়ের অনুন্নয়ন ও অবহেলার গল্প।
শিক্ষার্থীদের মতে, প্রতিবছর প্রকৃতির ছোঁয়ায় নবরূপে সেজে ওঠে প্রিয় ক্যাম্পাস। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পার হলেও এখনো দেখা মেলেনি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের। তাদের ভাষায়—প্রকৃতি এখানে উদার, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। কাশফুলে মোড়া এই প্রাঙ্গণের গভীরে লুকিয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা, নিঃশব্দ যন্ত্রণা ও অপেক্ষা। বাইরে থেকে যতটা সুন্দর, ভেতরে ততটাই ভঙ্গুর এই বিশ্ববিদ্যালয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বিস্তীর্ণ এলাকা পড়ে আছে অযত্নে অবহেলায়। এই অনাবাদি জায়গাগুলোতেই জন্মেছে কাশফুলের ঝাড়। সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অনুন্নয়নের চিত্র। হাতে গোনা কয়েকটি ভবন ছাড়া স্থায়ী স্থাপনার অভাব প্রকট। ক্যাম্পাসজুড়ে প্রায় ১১টি ডোবা রয়েছে, যেগুলোতে জমে থাকে নোংরা পানি ও আবর্জনা। তিনটি বড় পুকুরের মধ্যে দুটি বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে জলাশয়গুলোর প্রাকৃতিক রূপ ও কার্যকারিতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাতজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের; তাদের মধ্যে চারজন ছাত্র ও তিনজন ছাত্রী। তারা জানান, ১৫ বছর পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় এখনো নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। পর্যাপ্ত আবাসনের অভাবে প্রায় ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীকে শহরের বিভিন্ন মেসে থাকতে হয়। পরিবহন সংকটও গুরুতর। একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে স্থাপনার অভাবে—২৫টি বিভাগের জন্য মাত্র ৩৬টি ক্লাসরুম রয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে ছয়-সাত ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাত্র কক্ষ বরাদ্দ। এমনকি শিক্ষক ও ডিনদেরও বসার জায়গা নেই। তাদের দাবি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম যে সুবিধাগুলো থাকা উচিত, তার অনেকগুলোই এখানে অনুপস্থিত।
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুয়াদ হোসেন সাগর বলেন, “প্রতিদিন কাশফুলের সৌন্দর্য দেখি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের দুরবস্থা দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। ভবন নেই, গবেষণার সুযোগ নেই, পর্যাপ্ত ল্যাবও নেই। ভর্তি হওয়ার পর থেকে শুধু প্রতিশ্রুতি শুনছি, কিন্তু কোনো বাস্তব উন্নয়ন দেখিনি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক ও সিন্ডিকেট সদস্য মো. মোস্তাকিম রহমান বলেন, “এখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ক্লাসরুমের ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উদ্যোগের অভাব। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এখানে তা দেখা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবাই ভোগান্তিতে আছেন। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ, ভাড়া ভবন বা অস্থায়ী ক্লাসরুমের মতো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেত। অবহেলা আর উদাসীনতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, আর বাইরে আমরা শুধু কাশফুলের সৌন্দর্য দেখছি।”
তিনি আরও বলেন, “এই কাশফুল আসলে অনুন্নয়নের ফলে জন্ম নেওয়া আগাছা, যা এখন সৌন্দর্য বিলাচ্ছে। কিন্তু এগুলোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের প্রতীক।”
































