বড়দিনে যত বিচিত্র রেওয়াজ
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 86
তুষারশুভ্র কেশে, লাল–সাদা পোশাকে হাজির সান্তা ক্লজ, চারদিকে ভেসে আসে চিরচেনা ‘জিঙ্গেল বেলস’-এর সুর। আলো–ঝলমলে ক্রিসমাস ট্রি আর রঙিন সাজে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। আজ বড়দিন—খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন। শত শত বছর ধরে এই দিনটি বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজন ও উৎসবের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করে আসছেন মানুষ। তবে দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভেদে বড়দিনের রেওয়াজে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য।
বড়দিন বলতে সাধারণত উপহার বিনিময়, টার্কির রোস্ট, সাজসজ্জা আর পারিবারিক ভোজের কথাই বেশি শোনা যায়। কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে এমন কিছু রীতি আছে, যা জানলে অবাক হতে হয়।
ইউরোপের দেশ চেক প্রজাতন্ত্রে বড়দিনের প্রধান আকর্ষণ টার্কি নয়, বরং মাছ। সেখানে অনেক পরিবার বড়দিনের আগে জ্যান্ত মাছ কিনে এনে বাথটাবে রেখে দেন। উৎসব শেষে কেউ কেউ মাছটি রান্না করেন, আবার অনেকে সেটিকে জীবিত অবস্থায় নদী বা জলাশয়ে ছেড়ে দেন। সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কেউ কেউ মাছের আঁশ মানিব্যাগে রেখে দেন, যাতে সারা বছর অর্থকড়ির অভাব না হয়। এ ছাড়া বড়দিনে চেক প্রজাতন্ত্রের নারীদের মধ্যে জুতা ছোড়ার এক মজার খেলা আছে। জুতা যদি বাড়ির দরজার দিকে গিয়ে পড়ে, তবে বিশ্বাস করা হয়—শিগগিরই বিয়ের যোগ আসছে।
বেলারুশেও বড়দিন ঘিরে রয়েছে বিচিত্র লৌকিকতা। সেখানে মেয়েরা পানিতে গলিত মোম ঢেলে ভবিষ্যৎ স্বামীর চেহারা দেখার চেষ্টা করেন। আবার অশুভ শক্তি দূরে রাখতে খাবার টেবিলের পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার রীতিও রয়েছে। বড়দিনে অতিথি এলে আগে পুরুষদের ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়—এতে নাকি পুরো বছর শুভ কাটে।
গ্রিসে বড়দিনের প্রতীক হিসেবে এখনো ক্রিসমাস ট্রির চেয়ে নৌকার গুরুত্ব বেশি। ‘কারাভাকি’ নামে পরিচিত এই নৌকা গ্রিক সংস্কৃতিতে বড়দিনের প্রতীক। দেশটিতে প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, বড়দিনের সময় ‘কাল্লিকান্তজারোই’ নামে কিছু দুষ্ট আত্মা মানুষের ক্ষতি করতে বের হয়।
মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালায় বড়দিনের মৌসুম শুরু হয় ‘লা কেমা দেল দিয়াবলো’ বা ‘শয়তান পোড়ানো’ উৎসব দিয়ে। ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ছয়টায় শয়তানের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবে অনেকে পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসও আগুনে নিক্ষেপ করেন, যদিও পরিবেশদূষণের কারণে এই প্রথা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় বড়দিন উদ্যাপিত হয় ৭ জানুয়ারি। ‘গান্না’ নামে পরিচিত এই উৎসবের আগে ৪৩ দিন উপবাস পালন করেন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা। এই সময়ে মাংস, দুধ, ডিম ও চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করা হয়।
সিরিয়ায় বড়দিনে সান্তা ক্লজের জায়গা দখল করে উট। শিশুদের উপহার বিতরণে উটের ভূমিকা থাকে বিশেষ। কিংবদন্তি অনুযায়ী, তিন জ্ঞানী ব্যক্তি উটে চড়েই শিশু যিশুকে দেখতে গিয়েছিলেন, আর সেখান থেকেই এই প্রথার প্রচলন।
মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও বড়দিন ঘিরে রয়েছে ভিন্নধর্মী আয়োজন। উত্তর সুমাত্রায় ‘মারবিন্দা’ নামে পশু উৎসর্গের প্রথা চালু আছে। আবার রাজধানী জাকার্তায় বড়দিনে ‘রাবো রাবো’ নামের রীতিতে মানুষ একে অন্যের মুখে পাউডার মেখে শুভেচ্ছা জানায়।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় বড়দিন মানেই গ্রীষ্মকাল। তাই সেখানে বরফ নয়, রোদঝলমলে দিনে পরিবার–পরিজন নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে মানুষ। ব্যাট, বল আর স্ট্যাম্প নিয়ে চলে ক্রিকেট খেলা। বয়সের কোনো ভেদাভেদ নেই—বড়দিনের দিনে সবাই এক হয়ে মেতে ওঠে জাতীয় খেলায়।
বিশ্বজুড়ে বড়দিনের এই ভিন্ন ভিন্ন রেওয়াজ প্রমাণ করে, সংস্কৃতি আলাদা হলেও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অনুভূতি সর্বত্রই এক।




































