প্রেম, প্রতিরোধ ও কবিতা: শামসুর রাহমানের জীবন
- সর্বশেষ আপডেট ১১:২৮:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
- / 389
শব্দের ভেতর দিয়ে যিনি গড়েছিলেন স্বাধীনতার অনন্ত প্রবেশপথ; যিনি বর্ণমালার শরীরে প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়েছিলেন, আজ তাঁর অনুপস্থিতির দিন। শামসুর রাহমান। বাংলা কবিতার এক আধুনিক মিনার, যিনি শহরের কংক্রিট দেয়ালেও খুঁজে পেয়েছিলেন জ্যোৎস্নার ছায়া, আর মানবতার ক্লান্ত কণ্ঠেও শুনেছিলেন প্রেমের শেষ গান। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর অনুপস্থিতি যেন ঠিক অনুপস্থিত নয়, বরং রাস্তায় চলতে চলতে যখন নিঃশব্দে মাথা তুলে দাঁড়ায় কোনো গাছ, কিংবা হঠাৎ কোনো তরুণ কবির লেখায় ঝলকে ওঠে আত্মপ্রতিবাদের ভাষা, তখন বোঝা যায়; শামসুর রাহমান আছেন। তিনি আছেন প্রতিটি পঙ্ক্তিতে, দ্রোহে ও প্রতিটি নিঃশব্দ প্রতিবাদে।
২৩ অক্টোবর ১৯২৯। ঢাকার মাহুতটুলি তখনও আলো–ছায়ায় ঘেরা পুরোনো শহরের অন্তরঙ্গ এলাকা। সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন শামসুর রাহমান। তাঁর চোখে ছিল প্রশ্ন, আর মনে ছিল শব্দের আলোকসন্ধান। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল পারিপার্শ্বিক জীবন থেকে আহরিত সাহিত্যচেতনার এক প্রস্তুতি। স্কুলজীবন থেকেই কবিতার প্রতি আকর্ষণ, আর কৈশোরে এসে তা হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের ভাষা।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যয়ন করেছেন। এর ভেতর দিয়েই তিনি ছুঁয়ে দেখেছেন কাব্যভুবনের বহু প্রান্ত। যদিও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অসমাপ্ত, তবু কবিতার পাঠ তাঁর কখনও থামেনি।
বাংলা কবিতার এক বাঁকবদলের অংশ হয়ে ওঠেন শামসুর রাহমান। ১৯৪৯ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায়। এরপর ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। কাব্যিক ভাষায় ব্যক্তিগত আর রাজনৈতিক সত্তার মিলনে তিনি নির্মাণ করেন নাগরিক আত্মজিজ্ঞাসার এক নতুন ভূগোল।
তাঁর কবিতা কখনও ছিল স্বপ্নময় প্রেমের, কখনও ছিল স্বৈরাচারের মুখে ছুড়ে দেওয়া অদৃশ্য কুঠার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন; তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, বন্দি শিবির থেকে, নিজ বাসভূমে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা—এর মতো কবিতা। এসব কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়েছে।
শামসুর রাহমান ছিলেন কবিতার বাইরে সাংবাদিকতার জগতে এক দীপ্ত কণ্ঠস্বর। দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, উত্তরাধিকার; প্রতিটি পরিসরেই তাঁর কলম ছিল গভীর, বিশ্লেষণধর্মী এবং বিবেকসচেতন। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের রাজনৈতিক উত্থান–পতনের সময়ও তাঁর কবিতা কখনও নীরব থাকেনি। মৌলবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে তিনি ছিলেন স্পষ্ট সত্যকথনের পক্ষপাতী।
এমনকি নিজের জীবনও বাজি রেখেছেন বিশ্বাসের পক্ষে। ১৯৯৯ সালে মৌলবাদীদের হামলার মুখেও তাঁর কবিতা থামেনি। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অজস্র সম্মান তাঁর কণ্ঠে যুক্ত করেছে আলোকমালা। তবে শামসুর রাহমানের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি; তাঁর কবিতা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। জাতীয় চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে তাঁর সৃষ্টির সুর।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট। আজকের এ দিনে শহর ছিল তার নিয়মে ব্যস্ত। এরই মধ্যেই কবি শামসুর রাহমান নীরবে চলে যান। গানের মতো, কবিতার মতো, ছায়ার মতো ছিল তাঁর চলে যাওয়া। তবু চলে গিয়েও থেকে গেছেন। বাংলা কবিতার পাতায়, কিশোরের দ্রোহে, তরুণীর প্রেমে, বিপ্লবীর রক্তাক্ত স্বপ্নে। শামসুর রাহমান যেন এক অনন্ত ছায়া, যার ঘ্রাণ মিশে আছে এ মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
আজ যখন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে চলছে দখলযুদ্ধ, তখন শামসুর রাহমানের লেখা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়; সাহিত্য কেবল সৃজন নয়, দায়বদ্ধতাও। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রেম মানে দায়, স্বাধীনতা মানে প্রতিরোধ, আর কবিতা মানে প্রত্যয়ের উচ্চারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা মানুষের মজ্জায় না পৌঁছালে, তা শব্দের খেলাই থেকে যায়।
































