প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারে আইএলও ১৪১ সংশোধন দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩৯:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
- / 18
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিহীন, নারী ও আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারে রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী প্রার্থীদের কাছে আইএলও কনভেনশন ১৪১ ধারা সংশোধন এবং বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা । এছাড়া যৌথ চাষাবাদের জন্য সমবায় সমিতি নিবন্ধন, ভূমি ও কৃষিতে নারীর ন্যায্য অধিকার, বনজ সম্পদে আদিবাসী নারীর অধিকারের স্বীকৃতি, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য দূর করারও দাবি জানিয়েছেন।
আজ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানী সিরডাপের এ.টি.এম. শামসুল হক মিলনায়তনে এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি) এর আয়োজনে ‘এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ভূমিহীন, নারী ও আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বিশিষ্টজনেরা এ দাবি জানান।
এএলআরডি’র চেয়ারপার্সন এবং নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির এর সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনটির উপ-নির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি।
সম্মানিত আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য দেন রিব এর পরিচালক সুরাইয়া বেগম, বরিশালের স্পিড ট্রাষ্ট এর মিশন চিফ শামসুল ইসলাম দীপু, রাজশাহীর রুলফাও এর পরিচালক আফজাল হোসেন, চর্চা সম্পাদক সোহরাব হাসান, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ভূঁইয়া।
তৃণমূলের নারীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে জনসমবায় দলের নেত্রী রাহেলা আক্তার, পটুয়াখালী বাউফলের কৃষি শ্রমিক দলের মিতা রাণী, দিনাজপুরের চেহেলগাজী ইউনিয়নের জন সংগঠন নেত্রী সাবিনা হেমব্রম, ফরিদপুরের প্যারালিগ্যাল শাহনাজ বেগম।
রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আমাদের অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক নেতারা জিডিপিতে কৃষির অংশগ্রহণ কমছে- এটা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। কিন্তু জিডিপিতে কৃষির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বা কম এটা দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, উন্নয়ন এগুলোর উপর ভূমিকা রাখে না। ১১৩ জন ঋণখেলাপি এবারে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন যাদের ঋণখেলাপির পরিমাণ ১৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ভূমি, ভাত এবং ভোট এই তিনটা অধিকার আমাদের সাথে যুক্ত। কিন্তু আরেকটা ‘ভ’ যুক্ত হয়েছে, সেটা হচ্ছে ভয়। যেখানে জল-জমি-জঙ্গলকে রক্ষার আমাদের যেই আন্দোলন সেখানে এসে যুক্ত হয়েছে জাল-জালিয়াতি এবং জোর করে জমি কেড়ে নেওয়া। বাংলাদেশে ১২ লক্ষ ৮৮ হাজার পুকুর আছে। আমরা যদি ৪ জন নারীকে একটি করে পুকুর সমবায় হিসেবে দিতে পারি, তাহলে এই প্রত্যেকটা পুকুরে মাত্র ১০ হাজার টাকা জন প্রতি বিনিয়োগে বছরে ২-৩ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব । ৪৮ লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
খুশী কবির বলেন, এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলীয় প্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় এই বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
রওশন জাহান মনি প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার, অঙ্গীকার এবং প্রচারণার ক্ষেত্রে ভূমিহীন, নারী, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জোরালো করাই আমাদের উদ্দেশ্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীকে কৃষক ও জেলে হিসেবে আইনি স্বীকৃতি এবং সরকারি সাহায্য সমর্থন নিশ্চিত করার পূর্ব প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
তিনি বলেন, বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ, ২০২২ এ দেখা যায়, কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও জমির মালিকানায় তাদের অবস্থান মাত্র ২ শতাংশ। গত তিন দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে যত ঋণ সহায়তা বা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা সর্বসাকুল্যে পেয়েছে ২৪ ভাগেরও কম।
সোহরাব হাসান বলেন, আমরা একটা বৈষম্যপূর্ণ সমাজে আছি। সেখানে নারীরা বঞ্চিত, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। সেই ক্ষমতার জায়গাগুলো পরিবর্তন করতে হবে।
রাহেলা আক্তার বলেন, আমরা নারী সদ্যসরা যৌথ চাষাবাদ, যৌথ পুঁজি সংগ্রহ করি। আমরা মূলত প্রান্তিক ভূমিহীন। আমাদের দলের সদস্যরা যদিও সমবায় ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন তবুও আমরা সমবায় অধিদপ্তরের সহায়তা পাই না।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবি সমবায় আইন পরিবর্তন করে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সমবায় সমিতির নিবন্ধন সহজ করা হোক। আমরা এখন আমাদের দলের নামে সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার না করে জনসমবায় শব্দটি ব্যবহার করছি।
সাবিনা হেমব্রম বলেন, আদিবাসী নারীরা ভূমি ও কৃষির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু আদিবাসী নারীরা কৃষক হিসেবে স্বীকৃত নয়, তারা কৃষি কার্ড পায় না। আগামীতে যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তারা কীভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, খাস জমি বন্দোবস্ত এবং কৃষকের স্বীকৃতি দেওয়ার আহবান জানান তিনি।
মিতা রাণী বলেন, আমরা নারী কৃষকরা কৃষিক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি পাই না। আসন্ন নির্বাচনে যারা অংশ নিচ্ছেন তাদের কাছে আমাদের দাবি, তারা যেন নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি এবং কৃষি কার্ড ও কৃষি ঋণের ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন।
পদ্মা নদীর পাড়ের শাহনাজ বেগম বলেন, আমরা নারীর ভূমি অধিকার, ভূমি নিবন্ধন সম্পর্কে সচেতন হয়েছি। এখন যে সরকারই আসুক না কেন তারা যেন নারীর ভূমি অধিকার নিশ্চিতে কাজ করেন।
রিব এর সুরাইয়া বেগম বলেন, নারীকে ভূমির অধিকার দিলে পারিবারিক সহিংসতা কমে আসবে। অন্যদিকে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে বাড়ির প্রাঙ্গনে নারীরা যে চাষাবাদ করেন সেটা নিরাপদ কৃষি। যদি নারীদের হাতে ভূমি থাকে তবে নিরাপদ কৃষির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। রাসায়নিক কৃষি জলবায়ু পরিবর্তনে ৩৩ শতাংশ ভূমিকা রাখে। যদি নারীদের হাতে ভূমি থাকে তবে তারা জৈব সারের মাধ্যমে চাষাবাদ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তিনি আরো বলেন, আদিবাসী, ভূমিহীন ও নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারের বঞ্চনার মূলে রয়েছে কাঠামোগত বৈষম্য। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন তারা এই কাঠামোগত বৈষম্য নিরসনের দিকে দৃষ্টি দেবেন বলে প্রত্যাশা রাখছি।
শামসুল ইসলাম দীপু বলেন, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা, কৃষির উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলের দূরদর্শী চিন্তা থাকতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের অগ্রাধিকারে এই বিষয়গুলো নেই।
আফজাল হোসেন বলেন, ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, জাতীয় ভূমি কমিশন গঠন এবং নারীর ভূমি অধিকার নিশ্চিতে পারিবারিক আইন সংশোধন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমির স্বীকৃতি দিতে হবে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ কম, সেখানে কীভাবে আমরা আশা করবো নারীর অধিকার এবং নারীর ভূমি অধিকার বাস্তবায়িত হবে।
শামসুল হুদা বলেন, আমরা আদিবাসী, নারী, ভূমিহীনসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার নিয়ে কথা চালিয়ে যাব। যারা নির্বাচিত হবেন এবং যারা নির্বাচিত হবেন না সবাই এই দাবিগুলোতে আমাদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করবেন এই প্রত্যাশা রাখি। আমরা যারা সংসদে যাবো না তারা রাজপথে দাবি আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাবো।
দিদারুল ভূঁইয়া বলেন, ক্ষমতা যন্ত্র যতদিন ঠিক হবে না, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত হবে না। আমাদের দলে একজন ভূমিহীন, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পাদক রয়েছে। এবারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে নিবন্ধন দেওয়া হয় নি। তবুও আমরা থেমে থাকিনি। আমরা দুটো আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়েছি।
তিনি উপস্থিত আলোচকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা নিজেরাই রাজনৈতিক দল গঠন করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। আপনারা কেন ঐক্যমত্য কমিশন ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশনের দাবিতে ঘেরাও করেন নাই! বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামো জনগণের পক্ষে আনতে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।
এছাড়াও মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন আসাদুজ্জামান সেলিম (মউক, মেহেরপুর), উম্মে হাবিবা উপমা (এমডিএফ, নরসিংদী), শাহিদা খানম (এমডিএস), ইমরুল সাইদ রানা (পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন), ফেরদৌসি (এমএমএসএস)।




































