ঢাকা ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া বংড ক্যহ্

শরিয়ত খান, তিন্দু থেকে ফিরে
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:১০:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / 204

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া বংড ক্যহ্

প্রকৃতির রঙে রাঙানো এক অপার সৌন্দর্যের পাথরের দেশ। পাহাড়, নদী আর পাথরের এক অনন্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে এই জনপদকে। বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত পাহাড়ি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত সৃষ্টি-রাজা পাথর। স্থানীয়দের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বংড ক্যহ্’। দুই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী, আর সেই নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের দেশে মুকুটধারী রাজা পাথর। স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় এ পাথরের গল্প-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে থাকা এই বিশাল পাথর আজ তিন্দুর অন্যতম আকর্ষণ, যা প্রকৃতির অপরূপ সাজে মোড়ানো।

তিন্দু থেকে নৌকায় প্রায় আধঘণ্টা পথ পাড়ি দিলেই দেখা মেলে রাজা পাথরের। পাহাড়ি নদীর স্বচ্ছ নীলজলে ঘেরা এই পাথর যেন কোনো রাজকীয় আসনের মতো গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বলেন, এটি প্রকৃতির খেয়ালী শিল্পকর্ম; কেউ বলেন, বহু শতাব্দী আগে রাজা-রানির বাসস্থান ছিল এই পাহাড়চূড়ায়। বৃষ্টি, রোদ আর সময়ের ছোঁয়ায় পাথরটির গায়ে তৈরি হয়েছে নানা আকৃতির দাগ, যা দূর থেকে দেখতে মুকুটের মতো লাগে। এ থেকেই স্থানীয়দের মুখে নাম হয়েছে-রাজা পাথর।

প্রতিদিন দেশ-বিদেশসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে। রাজা পাথরের পাদদেশে দাঁড়িয়ে চারপাশের সবুজ পাহাড় আর ঝিরিঝিরি পানির শব্দ মিলে সৃষ্টি করে অপূর্ব এক দৃশ্য। কেউ আসে ছবি তুলতে, কেউ আসে নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে কিছুক্ষণ শান্তি খুঁজতে।

কথিত আছে, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন সাঙ্গু নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদী পাড়ি দিয়ে এসে এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। ফেরার সময় ভুলবশত তাঁর পাগড়ি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান। তাই সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। এ থেকেই পাথরটির নাম হয় ‘বংডহ’-অর্থাৎ পাথরের রাজা। এটি স্থানীয়দের কাছে একটি পবিত্র পাথর। ‘বংডহ’ ও ‘ক্যহপাজ্জা: স্বং’-এই দুই প্রাকৃতিক আকর্ষণ ঘিরে এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর এই পাথরের দেশ।

স্থানীয় বম ও মুরং সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এক মজার কিংবদন্তি-নাকি বহু বছর আগে এই অঞ্চলের এক রাজা পাহাড়ের চূড়ায় বসে বিচার দিতেন, আর সেই আসনটাই আজ “রাজা পাথর” নামে পরিচিত। ইতিহাস, প্রকৃতি আর লোককথা-সব মিলিয়ে রাজা পাথর আজ বান্দরবানের এক জীবন্ত গল্প। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির তেমন কোনো সরকারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে অনেক সময় পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যদি জায়গাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার করা হয়, তবে রাজা পাথর বান্দরবানের পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তিন্দু ইউনিয়নে প্রবেশের পর চারপাশে দেখা মিলছে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর। বিশাল আকারের পাথরের মাঝ দিয়ে পর্যটকদের নিয়ে বয়ে চলছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। আর পুরো পাথরের রাজ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজা পাথর বা বংড ক্যহ্। গোলাকার এই পাথর যেন মুকুটে মোড়ানো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাথরটি মুকুট পরে স্বচ্ছ নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাথরকে ঘিরে স্থানীয়রা করছেন প্রার্থনা, আবার পর্যটকরাও ভিড় জমাচ্ছেন এটি দেখতে। রাজা পাথর শুধু একটি পাথর নয়-এটি প্রকৃতির এক নিঃশব্দ রাজা, যে পাহাড়, নদী আর মানুষের গল্প একসঙ্গে বয়ে নিয়ে চলছে।

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা সোনাহী, অপূর্ব, প্রান্তসহ ছয়জনের একটি দল জানান, “শুধু রাজার পাথরের নাম শুনেছিলাম, কিন্তু কখনো আসা হয়নি। সুযোগ পেয়ে থানচিতে বেড়াতে এসে তিন্দুর রাজার পাথর দেখার পর মুগ্ধ হয়েছি।” তারা বলেন, “এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ, তবে জায়গাটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

থানচির পর্যটক গাইড ও নৌচালক ইমন ইসলাম ও অংশৈনু মারমা জানান, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক রাজা পাথর দেখতে আসেন। কেউ ছবি তুলে চলে যান, কেউ আবার সেখান থেকে লাংলোক ঝর্ণার পথে রওনা হন। প্রতিটি সফরের শেষে সবাই নিরাপদে ফিরে যান।

তিন্দু ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান মংপ্রু অং মারমা এবং ভাগ্যরাম ত্রিপুরা বলেন, ছোটবেলায় এই রাজা পাথরকে সবাই মানত ও পূজা করত। এখনো স্থানীয়রা সেই সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ধরে রেখেছেন। পর্যটকরা বেড়াতে গেলে সেই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলার আহ্বান জানান তারা।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য উবাথোয়াই মারমা বলেন, “রাজা পাথর বা বংড ক্যহ্ পাহাড়ের মানুষের কাছে একটি ধর্মীয় প্রতীক ও ঐতিহ্যের অংশ। আদিকাল থেকে স্থানীয়রা এটি ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি অনুসারে পূজা করে আসছেন। জেলা পরিষদ থেকে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সংস্কৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সাঙ্গুর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই অসংখ্য পাথর যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া বংড ক্যহ্

সর্বশেষ আপডেট ০৬:১০:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

প্রকৃতির রঙে রাঙানো এক অপার সৌন্দর্যের পাথরের দেশ। পাহাড়, নদী আর পাথরের এক অনন্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে এই জনপদকে। বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত পাহাড়ি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত সৃষ্টি-রাজা পাথর। স্থানীয়দের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বংড ক্যহ্’। দুই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী, আর সেই নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের দেশে মুকুটধারী রাজা পাথর। স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় এ পাথরের গল্প-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে থাকা এই বিশাল পাথর আজ তিন্দুর অন্যতম আকর্ষণ, যা প্রকৃতির অপরূপ সাজে মোড়ানো।

তিন্দু থেকে নৌকায় প্রায় আধঘণ্টা পথ পাড়ি দিলেই দেখা মেলে রাজা পাথরের। পাহাড়ি নদীর স্বচ্ছ নীলজলে ঘেরা এই পাথর যেন কোনো রাজকীয় আসনের মতো গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বলেন, এটি প্রকৃতির খেয়ালী শিল্পকর্ম; কেউ বলেন, বহু শতাব্দী আগে রাজা-রানির বাসস্থান ছিল এই পাহাড়চূড়ায়। বৃষ্টি, রোদ আর সময়ের ছোঁয়ায় পাথরটির গায়ে তৈরি হয়েছে নানা আকৃতির দাগ, যা দূর থেকে দেখতে মুকুটের মতো লাগে। এ থেকেই স্থানীয়দের মুখে নাম হয়েছে-রাজা পাথর।

প্রতিদিন দেশ-বিদেশসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে। রাজা পাথরের পাদদেশে দাঁড়িয়ে চারপাশের সবুজ পাহাড় আর ঝিরিঝিরি পানির শব্দ মিলে সৃষ্টি করে অপূর্ব এক দৃশ্য। কেউ আসে ছবি তুলতে, কেউ আসে নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে কিছুক্ষণ শান্তি খুঁজতে।

কথিত আছে, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন সাঙ্গু নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদী পাড়ি দিয়ে এসে এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। ফেরার সময় ভুলবশত তাঁর পাগড়ি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান। তাই সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। এ থেকেই পাথরটির নাম হয় ‘বংডহ’-অর্থাৎ পাথরের রাজা। এটি স্থানীয়দের কাছে একটি পবিত্র পাথর। ‘বংডহ’ ও ‘ক্যহপাজ্জা: স্বং’-এই দুই প্রাকৃতিক আকর্ষণ ঘিরে এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর এই পাথরের দেশ।

স্থানীয় বম ও মুরং সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এক মজার কিংবদন্তি-নাকি বহু বছর আগে এই অঞ্চলের এক রাজা পাহাড়ের চূড়ায় বসে বিচার দিতেন, আর সেই আসনটাই আজ “রাজা পাথর” নামে পরিচিত। ইতিহাস, প্রকৃতি আর লোককথা-সব মিলিয়ে রাজা পাথর আজ বান্দরবানের এক জীবন্ত গল্প। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির তেমন কোনো সরকারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে অনেক সময় পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যদি জায়গাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার করা হয়, তবে রাজা পাথর বান্দরবানের পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তিন্দু ইউনিয়নে প্রবেশের পর চারপাশে দেখা মিলছে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর। বিশাল আকারের পাথরের মাঝ দিয়ে পর্যটকদের নিয়ে বয়ে চলছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। আর পুরো পাথরের রাজ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজা পাথর বা বংড ক্যহ্। গোলাকার এই পাথর যেন মুকুটে মোড়ানো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাথরটি মুকুট পরে স্বচ্ছ নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাথরকে ঘিরে স্থানীয়রা করছেন প্রার্থনা, আবার পর্যটকরাও ভিড় জমাচ্ছেন এটি দেখতে। রাজা পাথর শুধু একটি পাথর নয়-এটি প্রকৃতির এক নিঃশব্দ রাজা, যে পাহাড়, নদী আর মানুষের গল্প একসঙ্গে বয়ে নিয়ে চলছে।

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা সোনাহী, অপূর্ব, প্রান্তসহ ছয়জনের একটি দল জানান, “শুধু রাজার পাথরের নাম শুনেছিলাম, কিন্তু কখনো আসা হয়নি। সুযোগ পেয়ে থানচিতে বেড়াতে এসে তিন্দুর রাজার পাথর দেখার পর মুগ্ধ হয়েছি।” তারা বলেন, “এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ, তবে জায়গাটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

থানচির পর্যটক গাইড ও নৌচালক ইমন ইসলাম ও অংশৈনু মারমা জানান, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক রাজা পাথর দেখতে আসেন। কেউ ছবি তুলে চলে যান, কেউ আবার সেখান থেকে লাংলোক ঝর্ণার পথে রওনা হন। প্রতিটি সফরের শেষে সবাই নিরাপদে ফিরে যান।

তিন্দু ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান মংপ্রু অং মারমা এবং ভাগ্যরাম ত্রিপুরা বলেন, ছোটবেলায় এই রাজা পাথরকে সবাই মানত ও পূজা করত। এখনো স্থানীয়রা সেই সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ধরে রেখেছেন। পর্যটকরা বেড়াতে গেলে সেই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলার আহ্বান জানান তারা।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য উবাথোয়াই মারমা বলেন, “রাজা পাথর বা বংড ক্যহ্ পাহাড়ের মানুষের কাছে একটি ধর্মীয় প্রতীক ও ঐতিহ্যের অংশ। আদিকাল থেকে স্থানীয়রা এটি ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি অনুসারে পূজা করে আসছেন। জেলা পরিষদ থেকে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সংস্কৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সাঙ্গুর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই অসংখ্য পাথর যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে।”