আরও কয়েকটি হাসপাতালে রয়েছে তার বিনিয়োগ
পিজির সাথেই চিকিৎসক আ’লীগ নেতার রোগী কেনা-বেঁচার হাট!
- সর্বশেষ আপডেট ০২:১৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫
- / 1586
রাজধানীর শাহবাগের পিজি হাসপাতালের ৩০০ গজ দূরত্বে রোগী কেনা-বেচাঁর হাট খুলে বসেছেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক। ডা: আবুল কালাম চৌধুরী নামের ওই চিকিৎসক পিজি হাসপাতালের জেনারেল সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন। একই সঙ্গে তিনি চাকরিবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাতিরপুল বাজারের পাশে লিবার্টি হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হাসপাতালটি গড়ে তুলতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাঁটান এই চিকিৎসক নেতা। হাসপাতালের অনুমোদন ও চালুর পূর্বে অন্তত সাতটি ভিন্ন ভিন্ন লাইসেন্সের প্রয়োজন হলেও, তাদের তিনটি লাইসেন্স নেই। বাকি যে চারটি লাইসেন্স রয়েছে; সেগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ।
এই হাসপাতালসহ আরো কয়েকটি হাসপাতালে ডা. আবুল কালাম আজাদ আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ, পুলিশ ও আমলার অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ করে দেন।

সম্প্রতি পিজি হাসপাতালে কর্মরত প্রফেসর ডা: আবুল কালাম চৌধুরী, ডা: শেখ মুজাম্মেল হক, ডা: ফরিদ রায়হান, ডা: শরিফ উদ্দিন সিদ্দিকী এবং সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের রেফার্ড বাণিজ্য, দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার তদন্ত চেয়ে অভিযোগ জমা পরেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এদের মধ্যে ডা: আবুল কালাম চৌধুরী একাধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সাথে জড়িত বলেও জানা গেছে।
আদালত সূত্র থেকে জানা যায়, লিবার্টি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে পূর্বের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বছির আহমেদ একটি সি আর মামলা (নং: ঈজ-২৭৫/২০২৩) দায়ের করেন।
এ মামলার সূত্র থেকে পূর্বের এমডি বছির আহমেদ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদক। ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং মিরপুর ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ডা: আবু নাসের বদরুদ্দোজার প্রায় কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে লিবার্টি হাসপাতালে।
দুদকের অভিযোগ সূত্র থেকে জানা যায়, পিজিতে চাকুরীর সাইনবোর্ডের পাশাপাশি ডা: আবুল কালাম চৌধুরী লিবার্টি হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়া ধানমন্ডি নিউ লাইফ হাসপাতাল, হবিগঞ্জ হেলথ কেয়ার হাসপাতালসহ ছোট বড় অনেকগুলো হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে তার বিনিয়োগ রয়েছে।
পিজি হাসপাতালের অপারেশনের দীর্ঘসূত্রিতা ও সেবার মান নিয়ে রোগীদের অসন্তোষ দীর্ঘকালের। অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের এই অসন্তোষ পুঁজি করে নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিত রোগী ভাগিয়ে নেন। এবং সেখানে নিজেই অপারেশন করেন।
নিজে সার্জন হওয়ার কারণে বিগত দুই বছরে অপারেশন বানিজ্য করে প্রায় কোটি টাকা আয় করেছেন তিনি। প্রতিদিন ৫-৭টা অপারেশন বানিজ্য করে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। যার অধিকাংশ রোগী পিজি হাসপাতালের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লিবার্টি হাসপাতালে অপারেশন করার মত যান্ত্রিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা নেই। বেশ কয়েকবার নানা লিগ্যাল ইস্যুর কারনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হাসপাতালটি বন্ধ করতে চাইলেও ডা: আবুল কালাম চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাবে তা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য এক্সরে মেশিন পরিচালনায় এটোমিক এনার্জি লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক জেনেও তিনি কোনো এটোমিক এনার্জি লাইসেন্স না করেই হাসপাতাল বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধান মতে, পরিবেশ, পারমানবিক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সনদ নেই লিবার্টি হাসপাতালের। এছাড়া ডিজি হেলথের দুটি (হাসপাতাল ও ডায়াগোনেস্টিক), একই সাথে কারখানা ও ফায়ার সার্ভিসের সনদেরও মেয়াদ নেই হাসপাতালটির।

অভিযোগে আরও যা আছে, হাসপাতাল চালুর পর থেকে দুর্নীতিবাজ ডাক্তার পরিচালক গ্রুপ কয়েকশো অপারেশন বানিজ্য করে; এর সকল মেডিকেল বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ছেড়ে দিচ্ছেন। আবুল কালাম এক্ষেত্রে কোন ইটিপি প্লান বা পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্সের তোয়াক্কা করেননি। তাই গত বছরের ৯ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর দুইলাখ টাকা জরিমানা, লাইসেন্স না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধের আদেশ প্রদান এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করেন। তবে এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে নিয়মিত অপারেশন বানিজ্যসহ পুরো হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সার্ভিস কার্যক্রম চালু রেখেছেন। সেক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশের বিরুদ্ধে একটি আপিল করে রেখেছেন।
শুধু তাই নয়; বিগত আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে বাড়িওয়ালার ১৩ মাসের ভাড়া বাবাদ ৬৫ লাখ, জেনারেটরের ২০ লাখ, ধার নেওয়া বাবদ ১৭ লাখ সহ মোট এক কোটি দুই লাখ টাকা প্রদান করেননি। এই বকেয়া ভাড়া চাইলেই আবুল কালাম চৌধুরী সিন্ডিকেট প্রবাসী বাড়িওয়ালাকে নানা হুমকি ধামকি দিয়েছেন।
আবুল কালাম চৌধুরী কোনরুপ মালিকানা কাগজপত্র ছাড়াই ফ্লোর দখলের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দুর্নীতিবাজ- ভুমিদস্যু মোতালেব টাওয়ারের রিয়া বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপণা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম, জমির মালিক আনোয়ার হোসেন, মনির হোসেনকে সাথে আলাদা তিনটা ভুয়া ভাড়া চুক্তি করে চরম ভূমিদস্যুতার কাজ করেছেন। এ ব্যপারে বাড়িওয়ালা একটি ভূমিদস্যুতার মামলা প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় আছে।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ থেকে ডা: আবুল কালাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিজ কর্মস্থল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালেও (পিজি হাসপাতাল) বেশ কিছু দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সেখানে দাবি করা হয়েছে, বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাঁটিয়ে তিনি পিজি হাসপাতাল এবং পিজি স্পেশালাইজড হাসপাতালের বিভিন্ন কেনাকাটায় পাহাড়সম অনিয়ম, চাকুরী বানিজ্যসহ বেশ কিছু দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ওই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক বিতাড়িত উপাচার্য প্রফেসর ডা: সরফুদ্দিন আহমেদ, প্রক্টর ডা: হাবিবুর রহমান দুলাল, প্রক্টর ডা: ফারুক মুন্সী, সাবেক পিএস ডা: রাসেল সিন্ডিকেটের সমন্বিত বিশেষ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
বর্তমান অবস্থায় ডা. আবুল কালাম চৌধুরী তাঁর এক সহকর্মী বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি হাসপাতাল) জেনারেল সার্জারী বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা: শেখ মুজাম্মেল হককে ব্যবস্থাপণা পরিচালক বানিয়ে নিজে আড়ালে থাকার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ডা: আবুল কালাম চৌধুরী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হুসাইন মোহাম্মদ মনিরুল আহসানের সাথে যোগাযোগ করে তাদের পাওয়া যায়নি।




































