ঢাকা ০৪:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা নেই, আছে শুধু কান্না আর শূন্যতা

আকাশ মারমা মংসিং, বান্দরবান
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
  • / 174

পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা নেই, আছে শুধু কান্না আর শূন্যতা

নয় বছরের কিশোর শৈসাইমং মারমা। চার বছর আগে মাকে হারিয়ে ছোট থেকেই তিনি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। প্রতিদিন ঘরের এক কোণে কখনো খেলা করেন, আবার মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে অশ্রু ঝরান। কিন্তু কিভাবে মা মারা গেছেন, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না ছোট্ট এই শিশুটি। মাকে না দেখলেও প্রতিদিন ছবির দিকে তাকিয়েই তার শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে।

নিজের বোনের মৃত্যুর সেই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নিহতের ছোটভাই সিংশাইমং মারমা। তিনি বোনকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। সিংশাইমং মারমা জানান, শৈমেপ্রু মারমা রেমাক্রী বাজারে থাকতেন; যা থানচি সদর থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে। ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর সকালে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শৈমেপ্রু হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে রেমাক্রী থেকে আড়াই ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিয়ে তাকে থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে এক ঘণ্টা পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার করেন।

কিন্তু হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে কোনোভাবে অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করে থানচি থেকে ৫০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ বেয়ে বান্দরবানের পথে রওনা হন তারা। কিন্তু চিম্বুকের বারো মাইল এলাকায় পৌঁছেই গর্ভে আট মাসের সন্তানসহ মারা যান শৈমেপ্রু মারমা।

একইভাবে সাখই কমান্ডার পাড়ার বাসিন্দা, চার সন্তানের জননী লেংরু ম্রোর স্বামী রেং য়ুং ম্রোও চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান। তিনি কিডনির অসুখে আক্রান্ত হয়ে থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে চিকিৎসা না পেয়ে বান্দরবানে রেফার করা হয়। চান্দের গাড়িতে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। স্বামী হারিয়ে তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লেংরু ম্রো।

দুর্গম থানচি উপজেলার ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একাধিকবার সংকটের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে জটিল রোগ বা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই রেফার করা হয় বান্দরবান সদর হাসপাতালে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে যাত্রাপথেই।

থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৯৯৫ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে চালু হয়। ২০১৮ সালে ইন্ডোর কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। আধুনিক ভবন, বিদ্যুৎ, পানি, সৌরবিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে কার্যত অচল হয়ে আছে এই হাসপাতাল।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০২০–২০২৫) এখানে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৯৮ জন রোগী। এর মধ্যে ৪৫৬ জনকে রেফার করা হয় সদর হাসপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ১৮১ জন এবং হাসপাতালে মারা গেছেন ১৭ জন রোগী। তবে রেফার করা অবস্থায় অন্তত ৭ জন রোগী বান্দরবান যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন।

থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ১২ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। ১৮ জন নার্সের জায়গায় আছেন মাত্র ৪ জন। নির্ধারিত ৪ জন মিডওয়াইফের পদেও একজনও নেই। ফলে হাসপাতালের কার্যক্রম প্রায় অচল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, ওষুধ, জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে এই হাসপাতাল নামমাত্র ৫০ শয্যার হলেও কার্যত চলছে ৩১ শয্যায়। চিকিৎসা সংকটের কারণে শতাধিক রোগী চলন্ত গাড়িতেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে থানচির প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অ্যাম্বুলেন্স চালক মংক্যসিং মারমা জানান, তিনি ২০১৯ সালে যোগদানের পর থেকে অন্তত ৭ জন রোগী তার গাড়িতেই মারা গেছেন। যারা মধ্যে শিশুও রয়েছে।

পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনবল না থাকায় হাসপাতাল কার্যত অচল। পোষ্টিংকৃত চিকিৎসকরাও প্রায়শই যোগদান না করে ডেপুটেশনে থাকেন।

থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ জানান, চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের কারণে জটিল রোগীদের স্থানান্তর করতে হয়। অনেক সময় পথে রোগীর মৃত্যু ঘটে। বারবার কর্তৃপক্ষকে জানালেও সমাধান হয়নি।

বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। এর ফলে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমস্যা দেখা দিয়েছে। নতুন নিয়োগ এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা নেই, আছে শুধু কান্না আর শূন্যতা

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫

নয় বছরের কিশোর শৈসাইমং মারমা। চার বছর আগে মাকে হারিয়ে ছোট থেকেই তিনি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। প্রতিদিন ঘরের এক কোণে কখনো খেলা করেন, আবার মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে অশ্রু ঝরান। কিন্তু কিভাবে মা মারা গেছেন, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না ছোট্ট এই শিশুটি। মাকে না দেখলেও প্রতিদিন ছবির দিকে তাকিয়েই তার শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে।

নিজের বোনের মৃত্যুর সেই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নিহতের ছোটভাই সিংশাইমং মারমা। তিনি বোনকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। সিংশাইমং মারমা জানান, শৈমেপ্রু মারমা রেমাক্রী বাজারে থাকতেন; যা থানচি সদর থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে। ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর সকালে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শৈমেপ্রু হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে রেমাক্রী থেকে আড়াই ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিয়ে তাকে থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে এক ঘণ্টা পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার করেন।

কিন্তু হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে কোনোভাবে অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করে থানচি থেকে ৫০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ বেয়ে বান্দরবানের পথে রওনা হন তারা। কিন্তু চিম্বুকের বারো মাইল এলাকায় পৌঁছেই গর্ভে আট মাসের সন্তানসহ মারা যান শৈমেপ্রু মারমা।

একইভাবে সাখই কমান্ডার পাড়ার বাসিন্দা, চার সন্তানের জননী লেংরু ম্রোর স্বামী রেং য়ুং ম্রোও চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান। তিনি কিডনির অসুখে আক্রান্ত হয়ে থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে চিকিৎসা না পেয়ে বান্দরবানে রেফার করা হয়। চান্দের গাড়িতে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। স্বামী হারিয়ে তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লেংরু ম্রো।

দুর্গম থানচি উপজেলার ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একাধিকবার সংকটের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে জটিল রোগ বা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই রেফার করা হয় বান্দরবান সদর হাসপাতালে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে যাত্রাপথেই।

থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৯৯৫ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে চালু হয়। ২০১৮ সালে ইন্ডোর কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। আধুনিক ভবন, বিদ্যুৎ, পানি, সৌরবিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে কার্যত অচল হয়ে আছে এই হাসপাতাল।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০২০–২০২৫) এখানে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৯৮ জন রোগী। এর মধ্যে ৪৫৬ জনকে রেফার করা হয় সদর হাসপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ১৮১ জন এবং হাসপাতালে মারা গেছেন ১৭ জন রোগী। তবে রেফার করা অবস্থায় অন্তত ৭ জন রোগী বান্দরবান যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন।

থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ১২ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। ১৮ জন নার্সের জায়গায় আছেন মাত্র ৪ জন। নির্ধারিত ৪ জন মিডওয়াইফের পদেও একজনও নেই। ফলে হাসপাতালের কার্যক্রম প্রায় অচল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, ওষুধ, জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে এই হাসপাতাল নামমাত্র ৫০ শয্যার হলেও কার্যত চলছে ৩১ শয্যায়। চিকিৎসা সংকটের কারণে শতাধিক রোগী চলন্ত গাড়িতেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে থানচির প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অ্যাম্বুলেন্স চালক মংক্যসিং মারমা জানান, তিনি ২০১৯ সালে যোগদানের পর থেকে অন্তত ৭ জন রোগী তার গাড়িতেই মারা গেছেন। যারা মধ্যে শিশুও রয়েছে।

পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনবল না থাকায় হাসপাতাল কার্যত অচল। পোষ্টিংকৃত চিকিৎসকরাও প্রায়শই যোগদান না করে ডেপুটেশনে থাকেন।

থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ জানান, চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের কারণে জটিল রোগীদের স্থানান্তর করতে হয়। অনেক সময় পথে রোগীর মৃত্যু ঘটে। বারবার কর্তৃপক্ষকে জানালেও সমাধান হয়নি।

বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। এর ফলে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমস্যা দেখা দিয়েছে। নতুন নিয়োগ এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।