পাহাড়ে ধর্ষণ: অন্তর্বর্তী সরকারকে দায় নিতে হবে
- সর্বশেষ আপডেট ১২:০২:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫
- / 347
পাহাড়ে ধর্ষণকে জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ধর্ষণ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা। আজ ২১ জুলাই ২০২৫, সোমবার দিঘীনালা উপজেলায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে উপস্থিত থেকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
রোনাল চাকমা বলেন, সম্প্রতি খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী স্থানীয় সেটেলার বাঙালিদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিহ্নিত ধর্ষকরা সবাই স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়ার নির্দেশে ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার ঘৃণ্য অপচেষ্টা চলছে। জেলা প্রশাসন বিএনপিকে রক্ষার জন্য চারজনকে গ্রেপ্তারের নাটক মঞ্চস্থ করেছে। অথচ গত ১৭ জুলাই ভাইবোনছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্ষিতার সহপাঠী, এলাকার ছাত্র-যুব সমাজ ও সাধারণ জনগণ বিচার চাইতে গেলে সেনাবাহিনী তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ করে রক্তাক্ত ও আহত করে। অর্থাৎ সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ধর্ষকদের রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই ঘৃণ্য ভূমিকা ধর্ষণকে জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত করেছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এর দায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সব ধর্ম, বর্ণ ও জাতিসত্তার মানুষ অংশ নিয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্রসমাজও তাতে নীরব দর্শক ছিল না। হাসিনার কথিত নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৯টি ভোটকেন্দ্র ছিল শূন্য। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পরে গত ১৮–২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে ২২০টিরও বেশি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও লুটপাট করা হয়েছে। সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তার প্রতিবেদন কোথায় আছে তা জানা নেই। বান্দরবানে কেএনএফ দমনের নামে শতাধিক বম নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কারা হেফাজতে ৩ জন বমের মৃত্যু হয়েছে, যা স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসেবে বান্দরবান ও রাঙামাটি সফর করেছে এবং আজ খাগড়াছড়িতে পদযাত্রা করছে। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তিনি পাহাড়ে অশান্তি ও বিভেদ দূর করতে চান। আমি তাঁর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা কিভাবে এই বিভেদ দূর করবেন? পাহাড়ে অশান্তির মূল কারণ তো সেনাশাসন এবং বহিরাগত সেটেলার বাঙালি। বিভেদকে টিকিয়ে রেখেছে রাষ্ট্র নিজেই। পাহাড়িরা বরাবরই সরল ও শান্তিপ্রিয়। তাঁরা হিংসা কিংবা বিভেদের পক্ষে নয়। আমাদের আবার নতুন করে সম্প্রীতির পাঠ শেখানোর দরকার নেই। গত ৫০ বছরে সেনাবাহিনীর কথিত ‘সম্প্রীতি ও উন্নয়নের’ গল্প আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর ল্যান্স দিয়ে পাহাড়কে দেখা হলে, পাহাড়কে বোঝা যাবে না, সমাধানও মিলবে না।
উক্ত মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দিঘীনালা উপজেলা সদস্য মিনা চাকমা। বক্তব্য দেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য সুইটি চাকমা, সাবেক ইউপি সদস্য কৃপা রঞ্জন চাকমা। সভাপতিত্ব করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি মিঠুন চাকমা।
সুইটি চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমা আমাদের প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়ে গেছেন। পাহাড়ে সেনা-সেটেলার থাকার কারণেই নারী ধর্ষণ, অপহরণ ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। একমাত্র সেনা-সেটেলার প্রত্যাহার ও স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে পাহাড়ি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
কৃপা রঞ্জন চাকমা বলেন, যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে নারী নিপীড়ন চলে আসছে। আজ যে শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, আগামীকাল তা আমার মেয়ের সাথেও ঘটতে পারে। তাই ধর্ষণ বন্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সভাপতি মিঠুন চাকমা বলেন, পাহাড়ি কিশোরী ধর্ষণের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে। অতীতে ধর্ষণের কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি বলেই আজ এমন অপরাধ বাড়ছে। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং পাহাড়ি নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে। অন্যথায় ছাত্র সমাজ বৃহত্তর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবে।
উক্ত প্রতিবাদী মানববন্ধনে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ অংশগ্রহণ করেন। সকাল ১০টায় বাবুছড়া কলেজ থেকে র্যালি বের হয়ে বাঘাইছড়ি গিয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর ঘটনার বিচার দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও স্লোগান বহন করেন—
“We want justice, we demand justice”, “আমাদের সহপাঠী ধর্ষণ কেন, প্রশাসনের জবাব চাই” ইত্যাদি।































