ঢাকা ০৪:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পশ্চিমবঙ্গে ফের নাগরিকত্ব আতঙ্ক , প্রতিরোধে মমতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৮:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 86

পশ্চিমবঙ্গে ফের নাগরিকত্ব আতঙ্ক , প্রতিরোধে মমতা

পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্বকে কেন্দ্র করে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বাংলার মানুষ মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এই আতঙ্কের প্রভাব ইতিমধ্যেই মারাত্মক— বীরভূমের ইলামবাজারে ৯৫ বছরের ক্ষিতিশ মজুমদার আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি চার দশক আগে বাংলাদেশের বরিশাল থেকে ভারতে এসেছিলেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় এবার যদি ‘অবৈধ নাগরিক’ ঘোষণা করা হয়— এই ভয়েই জীবনের ইতি টানেন তিনি।

গত ৭২ ঘণ্টায় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এমন তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে— দিনহাটা, পানিহাটি এবং ইলামবাজার। দুজন প্রাণ হারিয়েছেন, আরও অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের কর্মকাণ্ডের ফল বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর অঙ্গীকার জানিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ক্ষিতিশ মজুমদারের পরিবার জানিয়েছেন, এসআইআর ও এনআরসি নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিল। বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আমাদের কি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে?’ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিনি নিজের জীবন শেষ করেন। বৃদ্ধের দেহ উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তৃণমূল নেতারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।

রাজ্যজুড়ে এই ঘটনার পর প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিকমাধ্যমে লেখেন, এটি মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। নাগরিকত্বের এই ভয় মানুষের মনে ছড়িয়ে দেওয়া এক রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে ঘটনার দায় এড়িয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব প্রশ্নকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলার সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত— ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যাবে না এমন গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই জন্মসনদ, পৈতৃক সম্পত্তি দলিল খুঁজছেন। বিশেষ করে বয়স্করা ভয় পেয়ে পড়েছেন, কারণ স্বাধীনতা-পূর্বে জন্ম নেওয়া অনেকের কাছে আধুনিক প্রমাণপত্র নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি সরকার নাগরিকত্ব যাচাইকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই প্রক্রিয়া আসলে এনআরসির ইঙ্গিত বহন করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলায় কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না।

মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই শুরু হলে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ হবে। বাংলায় প্রশাসনিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক ভাষ্য মিলিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বাংলার মানুষ এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখে— একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব রাজনীতি, অন্যদিকে রাজ্য সরকারের প্রতিরোধ। ক্ষিতিশ মজুমদারের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে নতুন সংবেদনশীলতা দেখা দিয়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছেন, নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে আর কতজনের প্রাণ যাবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বাংলায় কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না। রাজ্য প্রশাসনও মৃত বৃদ্ধের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। কেবল নাম, তালিকা বা প্রশাসনিক স্বাক্ষরই নির্ধারণ করবে কারা নাগরিক আর কারা ‘অবৈধ’— এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াই চালিয়ে যাবেন শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পশ্চিমবঙ্গে ফের নাগরিকত্ব আতঙ্ক , প্রতিরোধে মমতা

সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৮:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫

পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্বকে কেন্দ্র করে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বাংলার মানুষ মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এই আতঙ্কের প্রভাব ইতিমধ্যেই মারাত্মক— বীরভূমের ইলামবাজারে ৯৫ বছরের ক্ষিতিশ মজুমদার আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি চার দশক আগে বাংলাদেশের বরিশাল থেকে ভারতে এসেছিলেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় এবার যদি ‘অবৈধ নাগরিক’ ঘোষণা করা হয়— এই ভয়েই জীবনের ইতি টানেন তিনি।

গত ৭২ ঘণ্টায় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এমন তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে— দিনহাটা, পানিহাটি এবং ইলামবাজার। দুজন প্রাণ হারিয়েছেন, আরও অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের কর্মকাণ্ডের ফল বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর অঙ্গীকার জানিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ক্ষিতিশ মজুমদারের পরিবার জানিয়েছেন, এসআইআর ও এনআরসি নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিল। বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আমাদের কি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে?’ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিনি নিজের জীবন শেষ করেন। বৃদ্ধের দেহ উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তৃণমূল নেতারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।

রাজ্যজুড়ে এই ঘটনার পর প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিকমাধ্যমে লেখেন, এটি মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। নাগরিকত্বের এই ভয় মানুষের মনে ছড়িয়ে দেওয়া এক রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে ঘটনার দায় এড়িয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব প্রশ্নকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলার সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত— ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যাবে না এমন গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই জন্মসনদ, পৈতৃক সম্পত্তি দলিল খুঁজছেন। বিশেষ করে বয়স্করা ভয় পেয়ে পড়েছেন, কারণ স্বাধীনতা-পূর্বে জন্ম নেওয়া অনেকের কাছে আধুনিক প্রমাণপত্র নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি সরকার নাগরিকত্ব যাচাইকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই প্রক্রিয়া আসলে এনআরসির ইঙ্গিত বহন করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলায় কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না।

মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই শুরু হলে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ হবে। বাংলায় প্রশাসনিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক ভাষ্য মিলিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বাংলার মানুষ এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখে— একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব রাজনীতি, অন্যদিকে রাজ্য সরকারের প্রতিরোধ। ক্ষিতিশ মজুমদারের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে নতুন সংবেদনশীলতা দেখা দিয়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছেন, নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে আর কতজনের প্রাণ যাবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বাংলায় কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না। রাজ্য প্রশাসনও মৃত বৃদ্ধের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। কেবল নাম, তালিকা বা প্রশাসনিক স্বাক্ষরই নির্ধারণ করবে কারা নাগরিক আর কারা ‘অবৈধ’— এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াই চালিয়ে যাবেন শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত।