অন্ধকারে শিকার, অন্ধকারেই বিক্রি
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে ইলিশ শিকার
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৪৩:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
- / 137
ভোরের আলো ফোটার আগেই মেঘনা নদীর ঘাটে শুরু হয় ব্যস্ততা। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বঙ্গারবাজার ঘাটে ট্রলার ভেড়ান স্থানীয় মৎস্যজীবী আনোয়ার হোসেন আনু ব্যাপারী। ট্রলারে ছিল সদ্য ধরা ইলিশ। ঘাটে আগে থেকেই উপস্থিত পাইকাররা মুহূর্তেই মাছগুলো কিনে ফেলেন। নিষেধাজ্ঞার কারণে সূর্য ওঠার আগেই শেষ হয় পুরো লেনদেন।
এই দৃশ্য কেবল বঙ্গারবাজারেই নয়—মেঘনার নয়নাবাদ, মধ্যারচর, দয়াকান্দা ও খাগকান্দা ঘাটেও একই চিত্র। অনেক জায়গায় ট্রলারেই চলছে কেনাবেচা। পাইকারদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও সুযোগ বুঝে মাছ কিনে নিচ্ছেন। ঘাটের পাশে নদীতীরেই গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। স্থানীয়রা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় এসব হাটে ইলিশ তুলনামূলক সস্তায় পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত এক শ্রেণির জেলে গোপনে নদীতে নামেন। কারেন্ট জাল ফেলে তারা জাটকা ও ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরছেন। নয়নাবাদ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ওহাব মিয়া বলেন, প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না। জেলে ও পাইকারদের মধ্যে আগেভাগেই মোবাইলে যোগাযোগ হয়। ট্রলার ঘাটে পৌঁছামাত্র পাইকাররা এসে ইলিশ কিনে নেন।
আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া, বিশনন্দী ফেরিঘাট, টেটিয়া, দয়াকান্দা, খাগকান্দা দক্ষিণ নয়াপাড়া ও চৈতনকান্দা এলাকাসংলগ্ন নদীপথে এসব কর্মকাণ্ড বেশি দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, ঘাটের পাশে বসা অস্থায়ী হাটে জাটকা প্রতি কেজি ২০০–৩০০ টাকা এবং বড় ইলিশ ৫০০–৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কম থাকায় আশপাশের মানুষ ভিড় করছেন এসব হাটে।
মৎস্যজীবী শাহীন মিয়া, শারফিন মিয়া ও রহমত আলী জানান, নিষেধাজ্ঞার এই সময় নদীতে ইলিশ বেশি ধরা পড়ে, তাই তাদের লাভও বেশি হয়। স্থানীয়রাও সুযোগ বুঝে ভোরে মাছ কিনে নিচ্ছেন।
নয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ডালিম শেখ বলেন, “প্রতিদিন ভোরে দক্ষিণ নয়াপাড়া ঘাটে অস্থায়ী হাট বসে। ট্রলারে মাছ আসে, আমরা সেখান থেকেই কিনে নিই।” খাগকান্দার মামুনুর রশিদও জানান, তিনি ভোরে ঘাট থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে ইলিশ কিনেছেন, কারণ দিনের বেলায় বাজারে ইলিশ মেলে না।
স্থানীয়রা আরও জানান, দিনের বেলায় কিছু দোকানে গোপনে ইলিশ বিক্রি হয়, আর সন্ধ্যার পর তুলনামূলকভাবে খোলামেলাভাবেই বিক্রি চলে, তবে দাম থাকে বেশি।
উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “ঘাটে অভিযান চালালে জেলেরা পালিয়ে যায়। বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে, আর নদীতে টহল জোরদার আছে।” তিনি জানান, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
খাগকান্দা নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ জয়নাল আবেদীন জানান, “আমরা মৎস্য অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালাই। এককভাবে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। খবর পেলেই টহল দিই, কিন্তু পুলিশ দেখলেই জেলেরা পালিয়ে যায়।”
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মেঘনার বিশনন্দী, দয়াকান্দা, চৈতনকান্দা, খাগকান্দা ও কালাপাহাড়িয়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এতে দুই লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও ১০ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়।
এর আগে ১৩ অক্টোবর যৌথ অভিযানে ৫০ হাজার মিটার অবৈধ জাল ও ৮ কেজি ইলিশ, ১১ অক্টোবর ৩০ হাজার মিটার জাল, ৭ অক্টোবর ৫০ হাজার মিটার জাল ও ৭ কেজি ইলিশ, আর ৩ অক্টোবর রাতে ১০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। উদ্ধার করা জাল জনসমক্ষে পুড়িয়ে ধ্বংস ও মাছ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়। তবে এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি।
মৎস্য অফিস জানায়, আড়াইহাজার উপজেলায় এক হাজার ৬০০ নিবন্ধিত জেলে আছেন। মেঘনাতীরবর্তী তিন ইউনিয়নে—বিশনন্দীতে ১৩৭, খাগকান্দায় ৩৫০ এবং কালাপাহাড়িয়ায় ১২০ জন জেলে রয়েছেন। এদের মধ্যে ৪৫০ জনকে ইলিশ প্রজনন মৌসুমে (৪–২৫ অক্টোবর) নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
































