নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ: প্রতিনিধিত্ব সংকটে গণতন্ত্র
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৫:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / 47
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, সহিংসতামুক্ত নির্বাচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ভূমিকা, গণভোটের গুরুত্ব এবং নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সংকট নিয়ে “সদস্য নির্বাচনে গণভোট” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলা হয়।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।
সভায় উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠন করা এবং জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘ সময় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হলে এবং রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়লে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়- যার উদ্দেশ্য গণতন্ত্রকে তার প্রকৃত জায়গায় ফিরিয়ে আনা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো নিরপেক্ষ কাঠামো নয়; বরং এটি জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগতভাবে বঞ্চিত- নারীরা তাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতি থেকে নারীদের ঝরে পড়া কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ও ক্ষমতাগত বৈষম্যের ফল। সামাজিক আন্দোলন ও সংগ্রামে নারীরা নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করলেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এসে তাদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে কমে যায়।
শারমীন এস মুরশিদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এখনো সংকীর্ণ নরমেটিভ কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ। ফলে দলীয়ভাবে নারীর নেতৃত্ব গ্রহণ করা হচ্ছে না। অনেক নারী প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে সাহসের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন- এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
তিনি জানান, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করেনি। দেশের ৫২ শতাংশ জনগোষ্ঠী নারী—তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব ছাড়া গণতন্ত্র অর্থবহ হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ। মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ৪.২৪ শতাংশ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত বড় সামাজিক আন্দোলন ও সক্রিয় অংশগ্রহণের পরও কেন নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে এসে ঝরে পড়ছেন- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রায় ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, যা নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে দল নারী প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়, তারা আদৌ গণতন্ত্রের মৌলিক অগ্রাধিকার পূরণ করছে কি না- এই প্রশ্ন সমাজ ও নারীদের নিজেদেরই তুলতে হবে।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও সহিংসতা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি জানান, নারী প্রার্থী ও নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সরাসরি মাঠে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে আগামী ১৭ জানুয়ারি “কুইক রেসপন্স টিম” উদ্বোধন করা হবে। প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়াররা ২৪ ঘণ্টা মাঠে সক্রিয় থেকে যেকোনো সহিংসতা বা হয়রানির ঘটনায় তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করবে।
তিনি নারী প্রার্থীদের সংগ্রামকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, দলীয় সমর্থন নিয়ে কিংবা স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়ে যারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন- সবাই কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এখানে এসেছেন। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি নারী প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা জানা এবং সেই আলোচনার ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি।
মতবিনিময় সভায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিনাত আরা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মী এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বক্তব্য দেন। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন।































