ঢাকা ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনের আগে আরপিওতে বড় পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৫:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
  • / 88

নির্বাচন কমিশন

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেছে। সোমবার (৪ নভেম্বর) জারি করা এই অধ্যাদেশে আগের কিছু ধারা পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে একাধিক নতুন বিধান, যা অনুযায়ী শিগগিরই নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণবিধি চূড়ান্ত করবে।

নতুন সংযোজন ও পরিবর্তন

নতুন সংশোধনীতে আদালত ঘোষিত ফেরারি বা পলাতক আসামির প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর পর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একক প্রার্থী থাকলে ‘না ভোট’ দেওয়ার ব্যবস্থা ফের চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি, একাধিক দল মিলে জোট গঠন করলেও প্রার্থীকে নিজের দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে—এ নিয়মও এবার যুক্ত হয়েছে। সমান সংখ্যক ভোট পড়লে লটারির পরিবর্তে পুনঃভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও জামানত

১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালতের ঘোষণায় ফেরারি বা পলাতক ঘোষিত কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। লাভজনক পদের দায়িত্বে থাকলেও প্রার্থী হওয়া যাবে না।

হলফনামায় এখন থেকে দেশি-বিদেশি আয় উৎস উল্লেখ বাধ্যতামূলক। ভুল বা অসত্য তথ্য দিলে নির্বাচন শেষে হলেও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে। মনোনয়নপত্রের জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভোটগ্রহণ ও প্রশাসনিক বিধান

৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতির দায়িত্ব জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ওপর দেওয়া হয়েছে। ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভোট বিঘ্নিত হলে বা ব্যালট বাক্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রিজাইডিং অফিসার বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাবেন, পরে ইসি নতুন তারিখ ঘোষণা করবে।

ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট ধারা (২৬ নম্বর) বাতিল করা হয়েছে। নতুনভাবে প্রবাসী, কর্মস্থল-বহির্ভূত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারাবন্দিদের জন্য আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং যুক্ত করা হয়েছে।

গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণ

২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোট গণনার সময়ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। ফল ঘোষণার আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রয়োজনে বাতিল ব্যালট পুনঃপরীক্ষা করতে পারবেন।

ব্যয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবার থেকে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ টাকা, আর মোট ব্যয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব অনুদানের উৎস অনলাইনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৭৩ নম্বর অনুচ্ছেদে মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, গুজব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহারকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ ইসিকে ক্ষমতা দিয়েছে প্রয়োজনে পুরো আসনের ভোট বাতিল করার।

আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা জরিমানা, আর রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

অন্যান্য সংশোধন

ডিআইজি পর্যায় পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলির তথ্য ইসিকে জানাতে হবে। দলীয় নিবন্ধন, অনুদান বা নিবন্ধন স্থগিত হলে দলের প্রতীকও স্থগিত করা হবে। কিছু অনুচ্ছেদে (৭৪, ৮১, ৮৭, ৮৯) ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় গণভোট সংক্রান্ত বিষয়ে ঐকমত্য হলে কমিশনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন এই সংশোধনী জারির মাধ্যমে নির্বাচন আইন সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এখন এই আরপিও অনুযায়ী দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি খুব শিগগিরই প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নির্বাচনের আগে আরপিওতে বড় পরিবর্তন

সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৫:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেছে। সোমবার (৪ নভেম্বর) জারি করা এই অধ্যাদেশে আগের কিছু ধারা পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে একাধিক নতুন বিধান, যা অনুযায়ী শিগগিরই নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণবিধি চূড়ান্ত করবে।

নতুন সংযোজন ও পরিবর্তন

নতুন সংশোধনীতে আদালত ঘোষিত ফেরারি বা পলাতক আসামির প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর পর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একক প্রার্থী থাকলে ‘না ভোট’ দেওয়ার ব্যবস্থা ফের চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি, একাধিক দল মিলে জোট গঠন করলেও প্রার্থীকে নিজের দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে—এ নিয়মও এবার যুক্ত হয়েছে। সমান সংখ্যক ভোট পড়লে লটারির পরিবর্তে পুনঃভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও জামানত

১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালতের ঘোষণায় ফেরারি বা পলাতক ঘোষিত কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। লাভজনক পদের দায়িত্বে থাকলেও প্রার্থী হওয়া যাবে না।

হলফনামায় এখন থেকে দেশি-বিদেশি আয় উৎস উল্লেখ বাধ্যতামূলক। ভুল বা অসত্য তথ্য দিলে নির্বাচন শেষে হলেও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে। মনোনয়নপত্রের জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভোটগ্রহণ ও প্রশাসনিক বিধান

৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতির দায়িত্ব জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ওপর দেওয়া হয়েছে। ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভোট বিঘ্নিত হলে বা ব্যালট বাক্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রিজাইডিং অফিসার বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাবেন, পরে ইসি নতুন তারিখ ঘোষণা করবে।

ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট ধারা (২৬ নম্বর) বাতিল করা হয়েছে। নতুনভাবে প্রবাসী, কর্মস্থল-বহির্ভূত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারাবন্দিদের জন্য আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং যুক্ত করা হয়েছে।

গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণ

২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোট গণনার সময়ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। ফল ঘোষণার আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রয়োজনে বাতিল ব্যালট পুনঃপরীক্ষা করতে পারবেন।

ব্যয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবার থেকে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ টাকা, আর মোট ব্যয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব অনুদানের উৎস অনলাইনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৭৩ নম্বর অনুচ্ছেদে মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, গুজব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহারকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ ইসিকে ক্ষমতা দিয়েছে প্রয়োজনে পুরো আসনের ভোট বাতিল করার।

আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা জরিমানা, আর রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

অন্যান্য সংশোধন

ডিআইজি পর্যায় পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলির তথ্য ইসিকে জানাতে হবে। দলীয় নিবন্ধন, অনুদান বা নিবন্ধন স্থগিত হলে দলের প্রতীকও স্থগিত করা হবে। কিছু অনুচ্ছেদে (৭৪, ৮১, ৮৭, ৮৯) ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় গণভোট সংক্রান্ত বিষয়ে ঐকমত্য হলে কমিশনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন এই সংশোধনী জারির মাধ্যমে নির্বাচন আইন সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এখন এই আরপিও অনুযায়ী দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি খুব শিগগিরই প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।