ইশতেহারে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:০০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 28
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি না থাকলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না- এমন অভিমত প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বিশিষ্টজন। তারা মনে করেন, নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি জরুরি।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত “প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে: ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এই দাবি জানানো হয়। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) রংপুরের বেগম রোকেয়া অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
গোলটেবিলে উপস্থিত ছিলেন- অধিকার কর্মী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ, স্বর্ণনারী এসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুশ্রী সাহা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুশান্ত ভৌমিক, বাংলাদেশ দলিত পরিষদের নেতা এডভোকেট মনিলাল রবিদাস, মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট নাসিমা খানম পপি, আদিবাসী নেতা ভূপেন পাহান, নীল শিকারি, উত্তম পাহান, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট নরেশ চন্দ্র সরকার, সুজন মহানগর রংপুরের সভাপতি এডভোকেট জোবাইদুল ইসলাম বুলেট, তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আনোয়ারা বেগম রানী, সাধারণ সম্পাদক সোনালী, ফাদার সাকিলিও বৈরাগী, সাঁওতাল আদিবাসী নেতা স্বপন হেমব্রম, সবুজ চন্দ্র বর্মন, অ্যাডভোকেট মুনির চৌধুরী, সুরেশ বাসফোর, সাংবাদিক মেরিনা লাভলী, লাবণী ইয়াসমিন, জাকির হোসেন, ওঁরাও সম্প্রদায়ের নেতা পলাশ টপ্য, আদিবাসী নেতা সুমন খালকো, এবং সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।
গোলটেবিলের শুরুতে সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, “একজন নাগরিক হিসেবে কি আপনি নিরাপদ? ভোট দিতে গিয়ে ভয় পান? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের বাস্তবতা নির্দেশ করে। গত ১৭-১৮ মাসে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা বেড়েছে, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে।”
অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি ব্যবহার করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ছোট করে দেখা হয়। বাস্তবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য রয়েছে। তাদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার হারানোর ঝুঁকি আছে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
মঞ্জুশ্রী সাহা বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের নাগরিক স্বীকৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, এবং ভূমি অধিকারসহ মৌলিক দাবি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদি নির্বাচনের পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সুশান্ত ভৌমিক বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে ও পরে তাদের ওপর কোনো হামলা বা অত্যাচার হবে না—এমন প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে থাকতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল বাড়াতে হবে।
ফাদার সাকিলিও বৈরাগী বলেন, সংখ্যালঘুদেরও সমান নাগরিক অধিকার রয়েছে। তাদের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হলে ন্যায়বিচার দাবি করতে পারে।
এডভোকেট মনিলাল রবিদাস বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবদান সত্ত্বেও তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হয়নি। নির্বাচনে তারা ভয়ভীতি ও সহিংসতার শিকার হয়—এ কারণে তারা নিরাপত্তা দাবি করেন।
আনোয়ারা বেগম রানী বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল স্রোত থেকে বাদ পড়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানে কাঠামোগত বৈষম্য আছে। তাই রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তাদের যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব দরকার, যাতে তাদের অধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রতিনিধিত্ব পায়।
নীল শিকারি বলেন, আদিবাসীদের অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের স্বীকৃতি ও সম্মান নিশ্চিত হয়নি। তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নিরাপত্তা চান। তাদের মত প্রকাশ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারণে তাদের অন্তর্ভুক্তি জরুরি।
জোবাইদুল ইসলাম বুলেট বলেন, আদিবাসীদের ভূমি দখল ও সামাজিক বৈষম্য তাদের নিরাপত্তাহীনতার বড় কারণ। তাদের জাতীয় নীতি ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন।
লাবণী ইয়াসমিন বলেন, আদিবাসীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, শিক্ষা ও সুযোগ না দেওয়া- এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। তাই সরকারি সহায়তা স্বচ্ছভাবে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
অ্যাডভোকেট নরেশ চন্দ্র সরকার বলেন, সংখ্যালঘু বলতে শুধু ধর্ম নয়, মতাদর্শের ভিন্নতাও বোঝায়। ভোটে ভীতু বা চাপগ্রস্ত জনগোষ্ঠী যেন নিরাপদে অংশ নিতে পারে- এটি আমাদের মূল লক্ষ্য।
অ্যাডভোকেট মুনির চৌধুরী বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ না বলে ‘পিছিয়ে পড়া মানুষ’ বলে ঐক্যবদ্ধ হলে অধিকার আদায় সম্ভব। নির্বাচনের আগে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
উত্তম পাহান বলেন, ভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাতে হবে।
সুমন খালকো বলেন, আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় জমি বিক্রি ও বৃত্তি নিয়ে সমস্যা। নির্বাচনে নিরাপদে ভোট দিতে চাই- এই দাবি জানান।
ভূপেন পাহান বলেন, সংখ্যালঘুদের স্বীকৃতি নিশ্চিত হলে তাদের অধিকারও সুরক্ষিত হবে। ভোটের সময় হিন্দু, আদিবাসী ও অন্যান্য কমিটিগুলোকে একসাথে কাজ করতে হবে।
জাকির হোসেন বলেন, সকল ধর্ম ও জনগোষ্ঠীকে সমানভাবে দেখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও সহমর্মিতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজু বাসফোর বলেন, হারিজন সম্প্রদায় এখনও স্বীকৃতি সনদ পায় না। তাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
সবুজ চন্দ্র বর্মন বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দল আন্তরিক নয়। নিরাপদ ভোটের পরিবেশ না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
সুরেশ বাসফোর বলেন, ভোটাধিকার শুধু সাংবিধানিক নয়- এটি গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের মৌলিক শর্ত। নিরাপত্তাহীনতায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ব্যর্থ।
পলাশ টপ্য বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও ভূমি দখল প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের বাস্তব অঙ্গীকার থাকা জরুরি।
জুয়েল লাকড়া বলেন, কার্যকর গণতন্ত্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বারবার দাবি করতে হয় না- রাষ্ট্র নিজ দায়িত্বে তা নিশ্চিত করে। তবে বাস্তবে বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা থাকায় জনভরসা কমে যাচ্ছে।
মেরিনা লাভলী বলেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ, জবাবদিহিতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা জরুরি।
































