নারী স্বপ্ন দেখে বাস্তবায়নও করে
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪২:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
- / 12
নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সুলতানা’স ড্রিমের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখেছিলেন অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণের। নারী স্বপ্ন দেখে এবং তা বাস্তবায়নও করে। তা প্রমাণ করলেন স্প্যানিশ নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরা তাঁর প্রথম অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে।
নারীস্থানে নারীদের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন স্থানের নারীদের জীবনযাপনের করুণ চিত্রও এখানে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। সেসঙ্গে ভারতে এসে নির্মাতা কিভাবে সুলতানা’স ড্রিম’ বইয়ের খোঁজ পেলেন এই চলচ্চিত্রে সেই অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। ভারতীয় জনগণ, সমাজ-সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। চিত্র নির্মাতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রের কাহিনীর শুরুটা করেছেন।
নির্মাতা ২০১২ সালে দিল্লি সফরে আসেন। একটি অটোতে চড়ে আর্ট গ্যালারিতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। অটো চালক প্রচন্ড জোরে বিভিন্ন সরু গলির ভেতর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অটো চালকের ব্যবহারে তার ভেতর ভয় কাজ করে। আর্ট গ্যালারির সামনে এসে অটো চালক থামে। তিনি অটো থেকে নেমে দ্রুত ভাড়া দিয়ে একটি আর্ট গ্যালারিতে ঢোকেন। সেখানে বৃষ্টির জন্য দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়েন। সেখানে তিনি ঘুরে ঘুরে বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলেন। তখনি তার হাতে আসে ‘সুলতানাস ড্রিম’ বইটি।

এত বছর আগে লেখা একজন নারী লেখকের বই, যেখানে নারীদের জন্য কল্পিত এক ভিন্ন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। বইটি পড়ে ইসাবেল বিস্মিত হন। প্রথম দেখাতেই বইটির প্রেমে পড়ে যান। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, এটা নিয়ে সিনেমা বানাবেন। পরিচালক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ‘ সুলতানা’স ড্রিম’ এর উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র তৈরির জন্য বাস্ক সরকারের কাছ থেকে চিত্রনাট্য লেখার অনুদান পান।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ‘ সুলতানা’স ড্রিম’ এর কিছু অংশ, ইসাবেল হারগুয়েরা পরিচালিত এবং জিয়ানমার্কো সেরার সাথে যৌথভাবে লেখা চিত্রনাট্য থেকে তৈরি হওয়া এই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি ২০২৩ সালে মুক্তি পায়।
তিনি ভারতীয় নারীদের জীবনযাপন জানতে আহমেদাবাদ, মথুরা, রাজস্থান বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। তেমনি রোকেয়ার জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দের মিঠুপুকুর গ্রামের দৃশ্য তুলে ধরেছেন। মথুরায় বিধ্বা নারীদের অমানবিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে, তাদের কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছেন কথা বললে তাদের টাকা দিবে! টাকা দিলে তারা কথা বলবেন। এরকম ঠাট্টা মশকরার সম্মুখীনও হয়েছেন নির্মাতা। রাজস্থানের নর্তকীদের নৃত্য, শিল্পকলা ইত্যাদি চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন।
ভারতীয় নারীরা যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়, সেটাও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। একজন নারী স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার জন্য উঁচু গাছের মগডালে উঠেন। কিন্তু প্রচন্ড ঝড়ে যখন ডালটা জোরে নড়ছিল তখন ওই নারী তা জাপটে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে উদ্বারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
‘সুলতানা’স ড্রিম’ ১৯০৫ সালে নারীবাদী কল্পকাহিনীর একটি চমৎকার ও নান্দনিক রূপান্তর। স্প্যানিশ শিল্পী ইনেসের মাধ্যমে `লেডিল্যান্ড’ বা নারীদের শাসিত রাজ্যের সন্ধানের এই চলচ্চিত্রটি ইসাবেল নারীবাদ, নিরাপত্তা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইরে নারীর মুক্তির দর্শন নিয়ে তৈরি করেছেন। নির্মাতা এটি বিভিন্ন অ্যানিমেশন শৈলীতে দৃশ্যমান করেছেন।

রোকেয়া তার উপন্যাসের নারীদের উপস্থাপন করেছেন শাসক হিসাবে। পুরুষরা সেখানে দুর্বল। সেই দুনিয়ার নাম ‘লেডিল্যান্ড’। আর এই ‘লেডিল্যান্ড’ আঁকতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ মেহেদি’ টেকনিক। ‘সুলতানাস ড্রিম’ আঁকা হয়েছে দ্বিমাত্রিক কালি ও জলরঙে।
ছবির তিনটি অংশই আলাদা অ্যানিমেশন কৌশল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। ইনেসকে কেন্দ্র করে গল্পের কিছু অংশ কালি এবং জলরঙ দিয়ে অ্যানিমেটেড করা হয়েছে, ছায়া পুতুলগুলো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের উপন্যাস এবং কাল্পনিক লেডিল্যান্ড মেন্দি ব্যবহার করে অ্যানিমেটেড করা হয়েছে ।
চলচ্চিত্রটি ইংরেজি ভাষায় হলেও বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্কসহ একাধিক ভাষার ব্যবহার রয়েছে। পালাগান, রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে বহে কিবা মৃদু বায়’
গানটিও পরিবেশিত হয়েছে।
এতে কলকাতার সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের লেখা একটি গানও রয়েছে, যার সংগীতায়োজন করেছেন তাজদির জুনায়েদ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন দীপান্বিতা আচার্য।
স্প্যানিশ চলচ্চিত্রকার ইসাবেল হারগুয়েরার নির্দেশনায় “সুলতানা’স ড্রিম”বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্সের ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচটি শাখায় দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।





































