ভোটের মাঠে লড়বেন মাত্র ৪ শতাংশ নারী
নারী ভোটার বেশি, কিন্তু প্রার্থী কম: নির্বাচনী বৈষম্য
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৫৫:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / 209
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার ভোটের মাঠে লড়বেন দেশের মাত্র ৪ শতাংশ নারী। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলে কোনো নারী প্রার্থীই মনোনয়ন পাননি।
নারীরা ঘর-সংসার, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি সব দায়িত্ব পালন করে রাজনীতিতে অংশ নেন। কিন্তু রাজনীতিতে দীর্ঘদিন লেগে থাকা এই নারীরাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পায় না। তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে নীতি নির্ধারণীতে ভূমিকা রাখবেন এমন নিশ্চয়তা রাজনৈতিক দলগুলো নারী রাজনৈতিক কর্মীদের দেয়না। রাজনৈতিক দলগুলো নারী কর্মীদের নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে বাধ্য দেশে এমন আইনগত বাধ্যবাধকতাও নেই; আর এই সুযোগটাই নেয় রাজনৈতিক দলগুলো- এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে সেই দলের নারী কর্মীরা নির্বাচনে লড়বেন না। ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ ( বিএনপি ) ১০ নারী সদস্যকে মনোনীত দিয়েছিল। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীকে সর্বোচ্চ মনোনয়ন দেওয়াও নজির। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আকস্মিক মৃত্যুতে সে সংখ্যা নয়- এ দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি’র ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নিজ দল থেকে বাদ পড়ায় স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। অন্যদিকে ‘বাসদ’ মার্কসবাদী দল নয় নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিয়েছে। এর ফলে দলের এক তৃতীয়াংশ নারী মনোনয়ন পেয়েছেন।
‘ইনসাফিয়া’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক দল ছয় নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিয়েছে। ‘এনসিপি’ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন মাত্র তিন নারী প্রার্থী । এনসিপি’র সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে নারী বিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতা নির্বাচনের মাঠে বড় প্রতিবন্ধকতা। তবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। আবার পুরুষ প্রতিনিধিরা নিজেদের দুস্কর্মের জন্য মনোনয়ন না পাওয়ার কারণে স্ত্রীর নামে মনোনয়ন নিয়েছে। এরফলে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মাঠে কাজ করা নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৮২ প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। যার মধ্যে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১০৭ নারী প্রার্থী । অর্থাৎ নারী প্রার্থী ৪.২ শতাংশ। তাদের মধ্যে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩৯ নারী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে ৬৮ নারী প্রার্থী রয়েছেন। তবে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে মোট কতজন টিকবেন, তা জানা যাবে ২০ জানুয়ারি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশে নারী-পুরুষ সমতা নেই এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যা ঘটে, তা সমাজেও প্রতিফলিত হয়। তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন কম এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। যতদিন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান না দেবে, ততদিন উন্নয়ন সম্ভব নয়। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা, জেলা স্তরে ৪০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ না থাকলে কোন কমিটি গঠন হবে না। নারী কমিশনকে অকার্যকর করা হয়েছে এবং এর সম্পর্কে সরকার থেকে কোনো মন্তব্যও করা হয়নি।
তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নারী প্রার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। অথচ নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোন মনোযোগ দেয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে। যা নির্বাচনে কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। আইন ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সবাই সমানভাবে সুবিচার পায়।
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করেনি। অথচ দেশের ৫২ শতাংশ জনগোষ্ঠী নারীর নির্বাচনে যদি প্রতিনিধিত্ব না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র কীভাবে অর্থবহ হবে।
উপদেষ্টা বলেন, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ। যা মোট ২ হাজার ৫৮২ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৪.২৪ শতাংশ। তিনি এটিকে অত্যন্ত হতাশাজনক উল্লেখ করে বলেন, এত বড় সামাজিক আন্দোলন ও সক্রিয় অংশগ্রহণের পরও আমরা কেন এই পর্যায়ে এসে ঝরে পড়ছি এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রায় ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি । যা নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে দল নারী প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়, তারা কি আমাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অগ্রাধিকার পূরণ করছে? এই প্রশ্ন সমাজ ও নারীদের নিজেদেরই করতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা. ফওজিয়া মোসলেম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীকে উন্নয়নে সহযোগিতা করা। দুটি বিষয় এক নয়। আমরা নারীকে অংশীদারিত্ব দিতে চাই, কিন্তু মালিকানা দিতে চাই না। এই জায়গাতেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করে তার অধিকারকে স্বীকৃতি দিবো, এটা দেওয়ার জন্য এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথ বা আশানুরূপ কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেনি। নারী আমাদের প্রত্যেকটা রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে থাকছেন, আন্দোলনকে এগিয়ে দিচ্ছেন। অনেক সময় পুরুষরা যখন আন্দোলনে থাকেন না, নারী নেতৃত্ব দেন। এরপরও নারীকে রাজনীতিতে যথাযথ মূল্যায়ন না করা, তার যোগ্যতাকে স্বীকার না করা আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি, লিঙ্গ বৈষম্যকে ধারণ করছে এরিই বর্হিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে নারী আন্দোলনকে আরো জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, নারী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া সত্বেও স্থান করে দেওয়া হচ্ছে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর সাথে ক্ষমতা বন্টন করতে আগ্রহী নয়। কিন্তু এটা ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়, এটা গণতন্ত্রের বিকাশের একটি অংশ। সেই ভাবনাটা আমাদের রাজনীতিতে নেই। আমাদের রাজনীতি ক্ষমতায়নের রাজনীতি, প্রতিহিংসার রাজনীতি। এ কারণে রাজনীতিতে নারীর যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে নারী প্রার্থী শূণ্যতা নিয়ে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, রাজনীতিতে ধর্মের সাথে যদি চৌর্যবৃত্তি করে ফেলি, তাহলে নারী অধিকারটা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে । জামায়াতে ইসলামীর নারী সদস্যরা বলছেন, আমাদের দলে অনেক নারী সদস্য রয়েছেন। কিন্তু তারা ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে এগিয়ে আসবেন। ধর্মীয় বিধি বিধান মানা ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর রাজনীতি হলো সামষ্টিক সামাজিক ব্যাপার। দুটোকে একসাথে মিলিয়ে ফেললে নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নারী প্রার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করলে খুবই নড়বড়েম দ্র্বুল একটি অবস্থান বলে মনে হচ্ছে বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজের অধ্যাপক তানিয়া হক।
তিনি জানান, যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম, সেখানে না থেকে আগের জায়গায় আমরা পৌঁছে গেলাম। নারীরা কি নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছেন না, নাকি তাদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না। এটা পুর্নবিবেচনা করা দরকার। একটা দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পুরুতান্ত্রিকতার একটি অংশ রাজনীতিতে যায়, তাহলে আবার একই জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে থাকবো। সবাইকে আবার নতুন করে চিন্তা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও আরো সচেতন হতে হবে। নইলে তা টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হবে। কারণ এই ৪ শতাংশ নারী দেশকে কি প্রতিনিধিত্ব করবেন। সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ রাজনীতির ধারা বজায় রাখা বাংলাদেশে সম্ভব হবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক তানিয়া হক।



































