নভোচারী জিম লাভেল মারা গেছেন
- সর্বশেষ আপডেট ১১:১৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৫
- / 87
নভোচারী জিম লাভেল মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। এই নভোচারী ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছিলেন। খবর বিবিসি’র।
নাসা জানিয়েছে, অ্যাপোলো ১৩ মিশনে বিস্ফোরণের কারণে চাঁদে অবতরণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও লাভেল ‘সম্ভাব্য এক বিপর্যয়কে সাফল্যে পরিণত করেছিলেন’।
বিস্ফোরণের সময় মহাকাশযানটি ছিল পৃথিবী থেকে কয়েক লাখ মাইল দূরে। কোটি দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলেন, কীভাবে লাভেল ও তার দুই সহকর্মী প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করেন— যা মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
লাভেল অ্যাপোলো ৮ মিশনেরও সদস্য ছিলেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি দুইবার চাঁদের কাছে গিয়েছিলেন, তবে কখনও অবতরণ করেননি।
নাসার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শন ডাফি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচিকে ‘ঐতিহাসিক পথে’ এগিয়ে নিতে লাভেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পরিবারের ভাষায়, ‘আমরা তার আশাবাদ, রসবোধ আর আমাদেরকে অসম্ভবকে সম্ভব মনে করানোর ক্ষমতাকে খুব মিস করব। তিনি ছিলেন সত্যিই অনন্য।’
১৯২৮ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে জন্ম নেন জেমস আর্থার লাভেল জুনিয়র। ছোটবেলা থেকেই তার বিমানের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান, মা একাই কষ্ট করে সংসার চালান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ- পরবর্তী সময়ে নৌবাহিনীর পাইলট চাহিদা তাকে সুযোগ এনে দেয়। নৌবাহিনী তার পড়াশোনার খরচ বহন করত এবং যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ দিত।
ঝুঁকি নিয়েই লাভেল ভর্তি হন আনাপোলিস নৌ-একাডেমিতে— যা পরে জীবনের অন্যতম সৌভাগ্যের সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
সেখানেই হাইস্কুলের সহপাঠী ম্যারিলিন গার্লাখের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে স্নাতক শেষ করার কয়েক ঘণ্টা পরই তারা বিয়ে করেন— দাম্পত্য জীবন টিকে ছিল ৭০ বছরেরও বেশি সময়।
নৌ-একাডেমিতে তার থিসিস ছিল এক নতুন বিষয়— তরল জ্বালানির ইঞ্জিন। স্নাতকের পর এই বিষয়ে কাজ করার আশা থাকলেও তাকে পাঠানো হয় বিমানবাহী রণতরীতে ‘ব্যানশি’ জেট চালাতে।
১৯৫৮ সালে নাসায় প্রথম আবেদন করেও সাময়িক অসুস্থতার কারণে বাদ পড়েন লাভেল। ১৯৬২ সালে দ্বিতীয় চেষ্টায় নির্বাচিত হয়ে যোগ দেন ‘নিউ নাইন’-এ—প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য পূরণের জন্য নির্বাচিত নাসার অভিজাত দলে।
প্রথম মহাকাশযাত্রায় ‘জেমিনি ৭’-এ তার সহযাত্রী ছিলেন ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান। মিশনের উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ সময় মহাকাশে টিকে থাকার সক্ষমতা পরীক্ষা করা। পরে ‘জেমিনি ১২’-এ নবীন নভোচারী বাজ অলড্রিনকে নিয়ে মহাকাশযানের বাইরে কাজের সক্ষমতা প্রমাণ করেন তিনি।
‘অ্যাপোলো ৮’-এ লাভেল, বোরম্যান ও উইলিয়াম অ্যান্ডারস প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেন। ১৯৬৮ সালের বড়দিনের আগের রাতে চাঁদের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—’আর্থরাইজ’। সেই মুহূর্তে লাভেল পৃথিবীর মানুষের জন্য পাঠ করেন বাইবেলের ‘বুক অব জেনেসিস’-এর অংশ—’ঈশ্বর আলোকে বললেন দিন, আর আঁধারকে বললেন রাত। সন্ধ্যা হলো, সকাল হলো—প্রথম দিন।’
অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফিরতেই লাভেল রসিকতা করে বলেন, ‘জানিয়ে রাখুন, সান্তা ক্লজ আছে।’ এই মিশন তাদের এনে দেয় তারকা খ্যাতি, যদিও চাঁদে প্রথম পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন।
সুইগার্ট তখন বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে সমস্যা হয়েছে।’ লাভেল বার্তাটি পুনরায় পাঠান—’হিউস্টন, আমাদের সমস্যা হয়েছে।’ এরপর লুনার মডিউল ‘অ্যাকোয়ারিয়াস’ ব্যবহার করে তারা প্রাণ বাঁচানোর লড়াই শুরু করেন। যদিও এটি পৃথিবীতে ফেরার জন্য তৈরি ছিল না, আপাতত এটিই ছিল একমাত্র আশ্রয়।
চার দিন ধরে শূন্যে ভেসে থাকার পর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় দীর্ঘ রেডিও-নীরবতা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ছয় মিনিট পর ভেসে আসে সুইগার্টের কণ্ঠ—প্যারাশুট খুলেছে, তারা নিরাপদে নেমেছেন।
নাসার ভাষায়, এটি ছিল ‘সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা’ এবং একই সাথে ‘সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত’।
চলচ্চিত্রে তাকে অ্যাডমিরালের পোশাকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে লাভেল রাজি হননি। নিজের নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেনের ইউনিফর্ম পরে অংশ নেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নিয়েছি, ক্যাপ্টেন হয়েই থাকব।’































