ঢাকা ০৩:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে বাস্তুচ্যুত দেড় লাখের বেশি মানুষ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:১৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
  • / 121

দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে বাস্তুচ্যুত দেড় লাখের বেশি মানুষ

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘাত ও বিরোধী মত দমনের কারণে ২০২৪ সালে এক লাখ ৫৯ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ৮০০ জন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিরা দেশে আছেন, নাকি দেশের বাইরে চলে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এই তথ্য জানিয়েছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে আইডিএমসি তাদের ওয়েবসাইটে এ-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করেছে। এর আগে আওয়ামী লীগের সময় ‘গায়েবি মামলা’র কারণেও বহু মানুষ বছরের পর বছর বাস্তুচ্যুত (ঘরবাড়িছাড়া) ছিলেন। এর বাইরে ধর্মীয় সংঘাত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বকেও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থা দুটি।

বিশ্বে বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আইডিএমসি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংস্থা নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

আইওএম ও আইডিএমসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ছিল চার লাখ ২৬ হাজার। গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এক লাখ ৫৯ হাজার বাংলাদেশি।

আইডিএমসি জানিয়েছে, মোট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির এ সংখ্যার (পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার) মধ্যে ১৯৭০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তুচ্যুত দুই লাখ ৭৫ হাজার মানুষও অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা বাদ দিলে গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ ১০ হাজার— বছরে গড়ে ১৯ হাজার ৩৭৫ জন। তবে গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি— এক লাখ ৫৯ হাজার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘের প্রায় সব সংস্থা আইডিএমসির তথ্য ব্যবহার করে থাকে।

জাতিসংঘের স্থানীয় কার্যালয়, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং সরকারি তথ্য ব্যবহার করেই প্রতিবেদন তৈরি করে আইডিএমসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইওএম ও আইডিএমসির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। ওই সময় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাত ছাড়াও ধর্মীয় সংঘাত ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এদের মধ্যে দুই হাজার ৮০০ জনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিরা দেশে আছেন না বিদেশে গেছেন— তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আইডিএমসি ও আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত ও সহিংসতায় ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ছয় হাজার জন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩০০, ২০১৯ সালে ২৯, ২০২০ সালে ২১০, ২০২১ সালে ১৫০ এবং ২০২২ সালে ১২০ জন।

২০১৭ সালে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে এক ইমেইল বার্তায় আইডিএমসি জানায়, ২০১৭ সালের জুনে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে ছয় হাজার মানুষ ঘরবাড়িছাড়া হয়েছিলেন। তবে তারা নিজ স্থানে ফিরে আসতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটির কাছে তথ্য নেই। সেই কারণে ২০১৭ সালে মোট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা চার লাখ ৩২ হাজার দেখানো হলেও পরের বছর তা কমিয়ে চার লাখ ২৬ হাজার দেখানো হয়।

আইডিএমসি আরও জানায়, ১৯৭০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির কারণ ছিল। ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ে দুই লাখ ৭৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তারা পুনরায় নিজ ভূমিতে ফিরতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ সংস্থাটির কাছে নেই। তাই ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখেছে আইডিএমসি।

এ সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যাও প্রকাশ করে। তাদের হিসাবে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস বা ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০২৪ সালে ২৪ লাখ দুই হাজার বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি ঘটে।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক কারণও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী। তবে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণও যুক্ত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে বাস্তুচ্যুত দেড় লাখের বেশি মানুষ

সর্বশেষ আপডেট ১০:১৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘাত ও বিরোধী মত দমনের কারণে ২০২৪ সালে এক লাখ ৫৯ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ৮০০ জন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিরা দেশে আছেন, নাকি দেশের বাইরে চলে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এই তথ্য জানিয়েছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে আইডিএমসি তাদের ওয়েবসাইটে এ-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করেছে। এর আগে আওয়ামী লীগের সময় ‘গায়েবি মামলা’র কারণেও বহু মানুষ বছরের পর বছর বাস্তুচ্যুত (ঘরবাড়িছাড়া) ছিলেন। এর বাইরে ধর্মীয় সংঘাত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বকেও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থা দুটি।

বিশ্বে বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আইডিএমসি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংস্থা নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

আইওএম ও আইডিএমসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ছিল চার লাখ ২৬ হাজার। গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এক লাখ ৫৯ হাজার বাংলাদেশি।

আইডিএমসি জানিয়েছে, মোট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির এ সংখ্যার (পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার) মধ্যে ১৯৭০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তুচ্যুত দুই লাখ ৭৫ হাজার মানুষও অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা বাদ দিলে গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ ১০ হাজার— বছরে গড়ে ১৯ হাজার ৩৭৫ জন। তবে গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি— এক লাখ ৫৯ হাজার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘের প্রায় সব সংস্থা আইডিএমসির তথ্য ব্যবহার করে থাকে।

জাতিসংঘের স্থানীয় কার্যালয়, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং সরকারি তথ্য ব্যবহার করেই প্রতিবেদন তৈরি করে আইডিএমসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইওএম ও আইডিএমসির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। ওই সময় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাত ছাড়াও ধর্মীয় সংঘাত ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এদের মধ্যে দুই হাজার ৮০০ জনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিরা দেশে আছেন না বিদেশে গেছেন— তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আইডিএমসি ও আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত ও সহিংসতায় ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ছয় হাজার জন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩০০, ২০১৯ সালে ২৯, ২০২০ সালে ২১০, ২০২১ সালে ১৫০ এবং ২০২২ সালে ১২০ জন।

২০১৭ সালে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে এক ইমেইল বার্তায় আইডিএমসি জানায়, ২০১৭ সালের জুনে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে ছয় হাজার মানুষ ঘরবাড়িছাড়া হয়েছিলেন। তবে তারা নিজ স্থানে ফিরে আসতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটির কাছে তথ্য নেই। সেই কারণে ২০১৭ সালে মোট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা চার লাখ ৩২ হাজার দেখানো হলেও পরের বছর তা কমিয়ে চার লাখ ২৬ হাজার দেখানো হয়।

আইডিএমসি আরও জানায়, ১৯৭০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির কারণ ছিল। ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ে দুই লাখ ৭৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তারা পুনরায় নিজ ভূমিতে ফিরতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ সংস্থাটির কাছে নেই। তাই ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখেছে আইডিএমসি।

এ সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যাও প্রকাশ করে। তাদের হিসাবে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস বা ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০২৪ সালে ২৪ লাখ দুই হাজার বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি ঘটে।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক কারণও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী। তবে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণও যুক্ত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।