দেশের ৭৬ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:০৪:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
- / 116
দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামীর বা জীবনসঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন— এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সাম্প্রতিক এক জরিপে। এতে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। জরিপটিতে জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে সহিংস আচরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন আচরণও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন (৭৬ শতাংশ) জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা জীবনসঙ্গীর হাতে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ নারী কখনও তাদের ওপর হওয়া সহিংসতা প্রকাশ করেননি।
নন-পার্টনার বা স্বামী ব্যতীত ব্যক্তিদের দ্বারাও সহিংসতার শিকার হয়েছেন অনেকে। ১৫ বছর বয়স থেকে ১৫ শতাংশ নারী অন্য কারও হাতে শারীরিক সহিংসতা এবং ২.২ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জরিপে ‘জীবনসঙ্গী’ বলতে বর্তমান বা প্রাক্তন স্বামী এবং ‘নন-পার্টনার’ বলতে অন্য যেকোনো ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে।
যদিও আগের তুলনায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৫ সালে স্বামী কর্তৃক সহিংসতার হার ছিল ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে ৪৯ শতাংশে নেমেছে। তবে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য নারীদের এখনও উল্লেখযোগ্য ব্যয় বহন করতে হয়, আর সামাজিক কুসংস্কার ও ভয় তাদের অনেককেই নীরব রাখে।
জরিপে দেখা যায়, দেশের অর্ধেকেরও বেশি নারী (৫৪ শতাংশ) জীবনে একবার হলেও স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬০ শতাংশ গত এক বছরে একাধিকবার এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। গর্ভাবস্থায় ৭.২ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ৫.৩ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন— যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
নন-পার্টনার কর্তৃক সহিংসতার ঘটনায় শাশুড়ি ও পুরুষ আত্মীয়দের সম্পৃক্ততা বেশি পাওয়া গেছে। যৌন সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে পরিচিতজনদের হাতে— যেমন পুরুষ আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি।
প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার বিষয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দেখা যায়, ৮.৩ শতাংশ নারী ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন ব্ল্যাকমেইল, ছবি নিয়ে অপব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।
সহায়তা চাওয়ার হারও খুব কম। সহিংসতার শিকার নারীদের মাত্র ১৪.৫ শতাংশ চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন, আর স্বামী কর্তৃক সহিংসতার শিকারদের মধ্যে ৭.৪ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগ স্থানীয় নেতার কাছেই সাহায্য চেয়েছেন। অন্যদিকে, নন-পার্টনার কর্তৃক সহিংসতার শিকারদের মাত্র ৩.৮ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেখানে বেশিরভাগই পুলিশের কাছে গেছেন।
অর্ধেকেরও কম নারী (৪৮.৫ শতাংশ) জানেন কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়, আর মাত্র ১২.৩ শতাংশ নারী সহায়তামূলক হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে জানেন।
জরিপে আরও বলা হয়েছে, নারীর কম বয়স, যৌতুক প্রথা, স্বামীর মাদকাসক্তি বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, এবং শহুরে বস্তিতে বসবাস নারীদের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। অপরদিকে, স্বামীর উচ্চশিক্ষা সহিংসতার ঝুঁকি কমায়। নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে নারীর কম শিক্ষা, অল্প বয়স ও প্রতিবন্ধিতা প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ানো, সেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং জেন্ডার সমতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি সহায়ক আইনগত ও নীতিগত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
































