স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
দুধ চা বারবার গরম করে খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:০৬:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 134
চা ভালোবাসেন না—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। দুধ চা, রং চা, ভেষজ চা, মসলা চা কিংবা গ্রিন টি—চায়ের বৈচিত্র্য যেমন বিস্তৃত, তেমনি রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন উপকারিতা। তবে এই পরিচিত পানীয় নিয়েই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিশেষ করে দুধ চা ও আদা চা বারবার গরম করে খাওয়া আদৌ নিরাপদ কি না—এ প্রশ্ন ঘিরেই আলোচনা তুঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ভাইরাল হওয়া একটি পোস্ট এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।
ওই পোস্টে দাবি করা হয়, চা বানানোর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই তা পান করা উচিত। এর পরে চা ফেলে দেওয়াই ভালো। কারণ সময় গড়ালে চা ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটানোর উপযোগী পরিবেশে পরিণত হয়। পোস্টে আরও বলা হয়, বাসি চা হজমতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর এবং বিশেষভাবে লিভারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি দাবি করা হয়, জাপানে ২৪ ঘণ্টা রেখে দেওয়া চাকে ‘সাপের কামড়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক’ বলা হয় এবং চীনে একে ‘বিষ’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।

এই ধরনের কড়া ভাষার দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। অনেকেই নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন—বাড়িতে তৈরি আদা চা যদি কয়েক দিন ধরে বারবার গরম করে খাওয়া হয়, তা কতটা নিরাপদ?
এই ভাইরাল দাবিগুলোর প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁদের মতে, দুধ চা সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত হয়ে যায় না। তবে চা যদি দীর্ঘ সময় ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার মধ্যে থাকে, তাহলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই তাপমাত্রাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ বলা হয়, যেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দুধ দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রবণতা থাকায় ঘরের তাপমাত্রায় রাখা দুধ চা দুই ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। ধীরে ধীরে পান করলে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। তবে বায়ুরোধী পাত্রে ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে রাখলে দুধ চা এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত নিরাপদ থাকতে পারে।
বারবার দুধ চা গরম করলে সব ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক নষ্ট হয় না। বরং অতিরিক্ত ফুটানোর ফলে ‘অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস’ নামের প্রদাহজনক যৌগ তৈরি হতে পারে। নিয়মিতভাবে এ ধরনের চা পান করলে এসিডিটি, ক্যাফেইনের প্রভাবে শরীরের পানিশূন্যতা, আয়রন শোষণে বাধা এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে দুধ ছাড়া আদা চা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে আদা চা সাধারণত তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। কখনো কখনো এক সপ্তাহও রাখা যায়, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর স্বাদ ও কার্যকারিতা কমে আসে। প্রতিবার ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে কয়েক দিন ধরে আদা চা গরম করে খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। তবে চা ঘোলা হয়ে গেলে, দুর্গন্ধ বের হলে বা ছত্রাক দেখা গেলে তা অবশ্যই ফেলে দিতে হবে। দৈনিক চার থেকে পাঁচ গ্রামের বেশি আদা গ্রহণ করলে বুকজ্বালার সমস্যা হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরে তৈরি আদা চা প্রদাহ কমাতে সহায়ক, হজমে সাহায্য করে এবং বমিভাব কমায়। তবে ফ্রিজে রাখার ৭২ ঘণ্টা পর থেকে এর কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে আদা চা দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চা নিরাপদে রাখার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সার্বিক পরামর্শ হলো—প্রতিদিন নতুন করে চা তৈরি করাই সবচেয়ে ভালো। ফ্রিজে রাখলেও দুধ চা তিন দিনের মধ্যে এবং আদা চা পাঁচ দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়া উচিত। খাওয়ার আগে চায়ে টক গন্ধ বা ঘোলাভাব আছে কি না, তা ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে এবং অবশ্যই ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে। দুধ চায়ের তুলনায় ব্ল্যাক টি সাধারণত বেশি নিরাপদ বলে মনে করা হয়।
আয়ুর্বেদের মতে, রেখে দেওয়া বা বারবার গরম করা দুধ চা শরীরে ‘আম’ বা বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে, যা হজমশক্তিকে দুর্বল করে। বারবার ফুটালে চায়ের ট্যানিনের মাত্রা বেড়ে যায়, প্রোটিনের গুণ নষ্ট হয় এবং তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এতে পিত্ত বৃদ্ধি পায়, এসিডিটি ও প্রদাহ বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, তাজা আদা চা কফ ও বাতের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হলেও ভেষজ চা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়াই শ্রেয়। মূল পরামর্শ হলো—প্রতিদিন তাজা চা তৈরি করা, দুই থেকে পাঁচ মিনিটের বেশি চা ফুটানো না এবং বেঁচে যাওয়া চা ফেলে দেওয়া। দুধের পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ বিকল্প ব্যবহার করলে ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাজা চা হজমশক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়, আর বাসি চা শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।





































