দাবির পাহাড় নিয়ে আজ বাজেট পেশ
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩০:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫
- / 268
জন-আকাঙ্ক্ষার অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে দাবির পাহাড়। সব প্রত্যাশার গন্তব্য যেন যমুনা। গত ১৫ বছর যেন সবাই তাঁদের চাওয়া-পাওয়া জমিয়ে রেখেছিল কোনো এক সুসময়ের পথ চেয়ে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন।
টানা চলছে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম। এসব দাবি মেটাতে প্রয়োজন বরাদ্দ। কিন্তু সরকারের হাত-পা বাঁধা। আয় সীমিত।
রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি। বিদেশি ঋণ শোধের চাপ। এর মধ্যেও নিত্য খরচের বোঝা। সব মিলিয়ে গলদঘর্ম অর্থ মন্ত্রণালয়।
এমন সময়েই এ সরকারের প্রথম বাজেট। সবাইকে তুষ্ট করার কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আজ জাতির সামনে এক বছরের আয় ও খরচের ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ধার-করজে তিনি যতটুকু ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছেন, তাতেও আরেক দফা করের বোঝা পড়তে যাচ্ছে ভোক্তার ঘাড়ে।
রাজনীতিতে নির্বাচনী শোরগোল আর অর্থনীতিতে নানা সংকটের বলয় ভেঙে অর্থ উপদেষ্টা মানুষকে কতটা সন্তুষ্ট করতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহের মধ্যেই তিনি আজ তুলে ধরবেন সাত লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার বাজেট। বাস্তবায়নের গতানুগতিক ধারার মধ্যেই তিনি ওই বাজেটে আশা করছেন অর্থনীতিকে একটি সুস্থির জায়গায় নিয়ে যাবেন।
যদিও বৈরী পরিবেশে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগে মন্থর গতি। নতুন বিনিয়োগে আস্থাহীনতা। কর্মসংস্থানের অভাবে দরিদ্রতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব চলছেই। এসব কিছুর মধ্যেও তিনি আশায় বুক বাঁধবেন নতুন অর্থবছরে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী এবারই প্রথম আগের অর্থবছরের চেয়ে ছোট বাজেট হচ্ছে। এই বাজেটে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রত্যাশা পূরণে উন্নয়নে খুব বেশি নজর দেওয়ার সুযোগ পাবে না সরকার। তবে এবার পরিচালন ব্যয়ে বেশ চাপে আছে সরকার। পরিচালন ব্যয় পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর নেপথ্যে সুদ ও বেতন-ভাতার ব্যয় বৃদ্ধি। সুদ পরিশোধ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় দুই লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা আগামী বছরে ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকি ব্যয় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষায় বড় ব্যয় হবে।
দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এসব ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। কারণ, চলতি অর্থবছরেও তেমন রাজস্ব বাড়াতে পারেনি। ন্যূনতম বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দার প্রভাবে আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব আয় হুমকিতে পড়তে পারে। ফলে নতুন বাজেটে পদক্ষেপ নিতে পারছে না সরকার। এর পরও আগামী বাজেটে সরকার বিনিয়োগে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে, যা জিডিপির ৩০.২৫ শতাংশ।
সরকার চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বড় ঘাটতির মুখে রাজস্ব আয়। ব্যবসার মন্দা পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার এনবিআর থেকে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আরও চ্যালেঞ্জে ফেলে দেবে। সরকার ঘাটতি মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ কমালেও বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা বাড়িয়েছে। সে ক্ষেত্রেও অর্থায়ন ঘাটতি মেটাতে বড় ধরনের শঙ্কা আছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে বৈষম্য কমাতে নতুন কোনো রোডম্যাপ থাকছে না। নেই কোনো চমক। অনেকটা গতানুগতিক ধারার বাজেট হচ্ছে। ফলে জনতুষ্টি পূরণ অনেকটা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আগামী বাজেট পতিত সরকারের আদলেই হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দু-চার টাকা হেরফের ছাড়া বাজেটে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সরকারের কাজে জনগণের যে প্রত্যাশা, তা পূরণে কিছু থাকছে বলে মনে হয় না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ভালো বাজেট বলতে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সাহায্য চাই, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি চাই, স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি চাই, উৎপাদন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে চাই, সার্বিক চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে জোরদার করতে চাই। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চাই, জীবন-যাপনের মানোন্নয়ন করতে চাই, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে রাজস্বনীতি চাই, মূল্যস্ফীতি সীমিত করতে চাই, অবকাঠামোর উন্নয়ন চাই।
তাঁর মতে, আয়ের বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য, রাজনৈতিক বৈষম্য—সবই বাংলাদেশে দিন দিন বেড়ে চলেছে। সরকারের কার্যক্রম বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। আমাদের এগুলো শনাক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে বাজেট কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেই; বরং করছাড় তুলে দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে। করপোরেট কর হার বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি অনেক পণ্যের ভ্যাট বাড়ানো, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার বৃদ্ধি, দেশীয় অনেক শিল্পের জন্য প্রতিরক্ষা না রাখা, ক্ষেত্রবিশেষে দেশীয় পণ্যকে আমদানি পণ্যের বিপরীতে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি বাড়াতে ব্যাপক শুল্কছাড়, বৈষম্যমূলক ব্যক্তি শ্রেণির কর হার, উচ্চবিত্তকে সুবিধা দিতে সারচার্জ অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের বিপরীতে চিনিসহ হাতেগোনা কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করছে। মূলত এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনতে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বাড়ানো হবে। তবে বিদ্যমান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মসূচি বাতিল হতে পারে।
বর্তমানে যেখানে ১৪০টি কর্মসূচি আছে, সেখানে নতুন ব্যবস্থায় ১০০টির নিচে নামিয়ে আনা হবে। এর মধ্যে ৩৮টি কর্মসূচিকে ‘দরিদ্রবান্ধব’ হিসেবে ধরা হবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর পরামর্শ অনুযায়ী করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই ৩৮টি কর্মসূচির সহায়তা মূলত অতিদরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১০০টির নিচে কর্মসূচিতে সরকার প্রায় ৯৫ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে পারে, যা মোট বাজেটের ১২.১৮ শতাংশ। অতিদরিদ্রদের জন্য ৩৮টি প্রকল্পে সরকার আগামী বাজেটে প্রায় ৫২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্য কর্মসূচিগুলোও আগামী বাজেটে অন্য খাতে বহাল রাখা হবে। সেগুলো একসঙ্গে যোগ করলে এ খাতে সর্বমোট বরাদ্দ দাঁড়াবে এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।
নগদ সহায়তা কিছু কর্মসূচির অধীনে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে মাসিক ভাতা মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
































