দক্ষিণ চীন সাগরে চোখ রাঙাচ্ছে ফুজিয়ান রণতরী
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৩:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 143
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি- পিএলএ নেভি সম্প্রতি ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখেছে। তাদের সবচেয়ে আধুনিক এবং তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী, `ফুজিয়ান’ গত সপ্তাহে সাংহাইয়ের জাহাজ কারখানা থেকে যাত্রা শুরু করে তাইওয়ান প্রণালী অতিক্রম করে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশ করেছে।
এ রণতরীর গন্তব্য নিয়ে এখন জোরালো আলোচনার ঝড় বইছে। এটি কি দক্ষিণ চীন সাগরেই স্থায়ী ঘাঁটি খুঁজে নেবে- তা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই প্রতিবেশি তাইওয়ানের।
ফুজিয়ানকে ঘিরে রয়েছে দুইটি শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার। নৌবাহিনীর দাবি, এ যাত্রা শুধুমাত্র “বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ মিশন” এর অংশ, যা একটি নতুন রণতরীর নির্মাণ প্রক্রিয়ার মানক ধাপ। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাস অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০১৯ সালে পিএলএ নেভির দ্বিতীয় রণতরী ‘শানডং’ একইভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর হাইনান দ্বীপের সান্যা ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল।
যদি একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তাহলে খুব শিগগিরই ফুজিয়ানও সান্যা নৌঘাঁটিতে যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর যদি সেটি সত্যি হয়, তবে চীনের তিনটি সক্রিয় রণতরীর মধ্যে দুইটি দক্ষিণ থিয়েটার কমান্ডের আওতাধীন এই আধুনিক ঘাঁটিতে অবস্থান নেবে।
বর্তমানে চীনের দুইটি প্রধান রণতরী ঘাঁটি রয়েছে- একটি উত্তরাঞ্চলের কিংদাওয়ে, যেখানে প্রথম রণতরী লিয়াওনিং অবস্থান করছে; আরেকটি দক্ষিণের সান্যা ঘাঁটিতে। দুটি ঘাঁটিই কমপক্ষে দুইটি রণতরী ধারণের সক্ষমতা রাখে।
দক্ষিণ চীন সাগরে ফুজিয়ানের অবস্থান নিছক কৌশলগত নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। শাংহাই-ভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক নি লেক্সিয়ং বলছেন,“সামরিক মোতায়েন সর্বদা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একটি অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী দক্ষিণ চীন সাগরে পাঠানো মানে দৃঢ় প্রতিরোধের বার্তা।”
চীনের বিস্তৃত দাবি এই সাগরকে ঘিরে, কিন্তু সেটি ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং আরও কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে স্কারবরো শোল ও সেকেন্ড থমাস শোলকে ঘিরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হয়।
শুধু দক্ষিণ চীন সাগরই নয়- তাইওয়ান প্রসঙ্গেও চীনের বিমানবাহী রণতরীগুলোর ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। অতীতের মহড়াগুলোতে দেখা গেছে, লিয়াওনিং এবং শানডং উভয়ই প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল অতিক্রম করে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে শক্তি প্রদর্শন করেছে।
যদিও তাইওয়ান ও পূর্ব চীন সাগর মূলত পূর্ব থিয়েটার কমান্ডের দায়িত্বে, সেখানে কোনো রণতরী ঘাঁটি নেই। এ কারণে বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইনানের সান্যা ঘাঁটি থেকেই চীন সহজেই তাইওয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে।
চীনের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোও রাখা হয়েছে হাইনানের ইউলিন ঘাঁটিতে, যার গভীর সমুদ্র প্রবেশাধিকার রয়েছে। এ ঘাঁটি থেকে রণতরী ও সাবমেরিন একত্রে মোতায়েন করা সম্ভব, যা সমুদ্রযুদ্ধে শক্তিশালী সমন্বয় সৃষ্টি করে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুজিয়ান দূরে থেকেও কার্যকর থাকবে। এর যুদ্ধবিমানগুলো প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশ শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম। অর্থাৎ, এটি প্রতিপক্ষের বেশিরভাগ অ্যান্টি-শিপ অস্ত্রের নাগালের বাইরে থেকেও আক্রমণ পরিচালনা করতে পারবে।
চীন দাবি করছে, ফুজিয়ান বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনভেনশনাল শক্তিচালিত যুদ্ধজাহাজ। উন্নত ক্যাটাপাল্ট সিস্টেম, অধিক সংখ্যক বিমান বহনের ক্ষমতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এটি এক নতুন যুগের প্রতীক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- ফুজিয়ান কেবল প্রতিরক্ষা নাকি আক্রমণাত্মক কৌশলের অংশ? যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান এ অঞ্চলে ক্রমাগত নজর রাখছে। তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতে ফুজিয়ানের ভূমিকা নিয়ে এখনই গভীর বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক সং ঝংপিং বলেন, “বিমানবাহী রণতরীগুলোকে সবসময় ঘাঁটিতে থাকতে হয় না। এগুলো দীর্ঘ সময় সামনে মোতায়েন থাকে, যেমন দক্ষিণ চীন সাগর বা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে।”
চীনের হাতে বর্তমানে মাত্র তিনটি বিমানবাহী রণতরী আছে- লিয়াওনিং, শানডং, আর ফুজিয়ান। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ও দক্ষিণে দুটি ঘাঁটি আপাতত যথেষ্ট। তবে ভবিষ্যতে যদি আরও রণতরী আসে, তখন নতুন ঘাঁটি নির্মাণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ফুজিয়ানের যাত্রা তাই শুধু একটি সামরিক মোতায়েন নয়—এটি দক্ষিণ চীন সাগরের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এক নতুন শক্তির আগমন। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে, ফুজিয়ান সত্যিই কি দক্ষিণ চীন সাগরে স্থায়ী ঘাঁটি নেবে, নাকি এটি হবে চীনের আরও বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার শুরু?
তথ্য সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট




































