তিন মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে সাত বিলিয়ন ডলার
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৩০:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 68
বিদেশ থেকে বাংলাদেশের ঋণ গ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় সবটাই সরকারি খাতে। এতে গত জুনের শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ১১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আলোচ্য তিন মাসে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, এআইআইবি সহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডলারের সংকট চলছিল। এই সংকট সামাল দিতে পূর্বের সরকারের আমলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবুও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পতন বন্ধ করা যায়নি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে রিজার্ভের পতন থামাতে সক্ষম হয়েছে। ডলারের বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা এসেছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাওয়াই এর অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আসায় এখন বিদেশি ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি কমে এসেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে পরিশোধের সময় চাপ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বিদেশি ঋণের মধ্যে সরকারের ঋণই বেশি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি ঋণ প্রয়োজন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে বিদেশি ঋণ নিয়ে অপচয় হয়েছে। সেগুলো যদি বন্ধ না হয়, তাহলে ঋণ বৃথা হয়ে যায়। আর যদি ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জিডিপি অনুপাতে বিদেশি ঋণ এখনো সহনীয় মাত্রায় আছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের অঙ্ক অনেক বেড়েছে। ফলে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও পরিশোধ করতে গেলে চাপ অনুভূত হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১,২১৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ১১২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। গত মার্চ পর্যন্ত আগের তিন মাসে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ জুন পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৭ দশমিক ০২ বিলিয়ন বা ৭০২ কোটি ডলার।
গত বছরের ডিসেম্বরে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১০৩ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৪ সালের শেষ তিন মাসে বিদেশি ঋণ কমেছিল। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১০৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা ডিসেম্বরে কমে হয় ১০৩ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত জুনের শেষে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। তিন মাস আগে এটি ছিল ৮৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, গত জুনের শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের স্থিতি কমে ১৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। তিন মাস আগে এটি ছিল ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের স্থিতি কমেছে ০ দশমিক ১১ বিলিয়ন বা ১১ কোটি ডলার। যদিও এ সময়ে বেসরকারি খাতে ৭ কোটি ডলারের বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেড়েছে, তবু বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধ বেশি হওয়ায় স্থিতি কমেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, “দেশি উৎসের তুলনায় বিদেশি ঋণের সুদের হার এখন তুলনামূলক কম। ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও বিদেশ থেকে ঋণে ঝুঁকছেন। তবে ঢালাইভাবে সবাই যাতে ঋণ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। বিশেষ করে যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় আয় নেই, তাদের বিদেশি ঋণ নেওয়া ঠিক হবে না।”
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার বিদায় নেওয়ার পর (২০০৬ সালের শেষে) বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের কম ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে তা প্রায় ২.২৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ২০০৮ সালের শেষে স্থিতি দাঁড়ায় প্রায় ২১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এরপর আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তা ৮২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ১০৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
































