নারী মৈত্রীর মতবিনিময় সভায়
তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:০০:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 0
তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে এটিকে আইন হিসেবে কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশটি যেন কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে লক্ষ্যে আসন্ন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এটি পাস করে আইনে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরা।
আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নারী মৈত্রীর আয়োজনে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫ ও পরবর্তী করণীয়’ বিষয়ে নারী ফোরামসমূহের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এই মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা। নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিসিআইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান এবং সিটিএফকে-বাংলাদেশ এর লিড পলিসি এডভাইজর মো. মোস্তাফিজুর রহমান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নারী মৈত্রীর কোঅর্ডিনেটর নাসরিন আকতার।
এছাড়াও সভায় বক্তব্য প্রদান করেন, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) বাংলাদেশ এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার আব্দুস সালাম মিয়া, নারী মৈত্রী মাদার্স ফোরামের আহ্বায়ক শিবানী ভট্টাচার্য, টিচার্স ফোরামের আহ্বায়ক ও অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম, দৈনিক যুগান্তরের উপ সম্পাদক মিজান চৌধুরী, নারী মৈত্রী মাদার্স ফোরামের উপ আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ পলি এবং ইয়ূথ এডভোকেট মো. রাইসুল ইসলাম ও শাহরীন ফেরদৌস। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নারী মৈত্রীর প্রোগাম অফিসার সালমা আকতার শান্তা।
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ১৩ লক্ষেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা বেশি) তামাক ব্যবহার করে। তার মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে। প্রতিদিনের হিসাবে যা ৫৪৫ জনেরও বেশি। অন্যদিকে তামাক ব্যবহারজনিত কারণে প্রতিবছর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৩৯.২ হাজার কোটি টাকা প্রায়। তামাকের এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসনকে তাই তামাক মহামারী হিসেবেই গণ্য করা যায়।
এমতবস্থায় উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে (২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫) স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়েছে।
অনুমোদিত অধ্যাদেশে ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টস এর ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছে; ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় নিকোটিন পাউচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপানের পাশাপাশি সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখার বিধান সরকারের নির্দেশনার শর্তাধীন করা হয়েছে; ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহণ’-এর সংজ্ঞা ও অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে; বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শনসহ ইন্টারনেট বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এবং তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে বিদ্যমান ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৭৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সতর্কবাণী মুদ্রণের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
অনুমোদিত এই অধ্যাদেশটির কার্যকর বাস্তবায়নে সংসদে পাস করে আইনে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।
সভার স্বাগত বক্তব্যে নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি বলেন, তামাকের ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ১১ শতাংশেরও বেশি নারী মৃত্যুবরণ করে তামাকজনিত রোগে। প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে এই তামাকজনিত কারণে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করেছে। এ জন্য আমি অন্তবর্তীকালীন সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। আমি আশাবাদী, এই অধ্যাদেশের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও, চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যুর কারণে এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ক্ষতি ও প্রাণহানি রোধের লক্ষ্যে অন্তর্র্বতী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই অবস্থান যদি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও অব্যাহত রাখে, তবে সংসদে আইনটি পাস হতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। সে কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই আইনের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাাচনের পর সংসদের প্রথম অধিশেনেই অধ্যাদেশটিকে পাস করে আইনে রূপান্তর করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের ব্যাপক জনসমর্থন আদায় করতে হবে, যাতে করে এটি একটি জনদাবি হয়ে ওঠে। তাহলে সরকার আর এটিকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
অধ্যাদেশটির বাস্তবায়ন ও আইনে পরিণত করতে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন তারা।



































