ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তফশিলের পর চার হত্যাকান্ড, তবুও ‘ভালো পরিবেশ’ দাবি সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৫:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 14

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম

নির্বাচনি তফশিল ঘোষণার পর চারজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ আগের সরকারের সময়ের তুলনায় ভালো বলে দাবি করেছে সরকার, যা একদিকে সহিংসতার বাস্তব চিত্রকে সামনে আনে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার একটি স্পষ্ট দূরত্বও তুলে ধরে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছেন। তিনি এসব ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বলেন, তারপরও নির্বাচনের পরিবেশ বিগত সরকারের আমলের চেয়ে ভালো।

তার বক্তব্যে অতীতের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি জানান, ২০১৪ সালের আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতায় অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভালো’ বলেই বিবেচনা করা যায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন তুলনামূলক সহিষ্ণুতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এই বক্তব্যের ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: প্রাণহানির সংখ্যা কম হওয়াই কি একটি নির্বাচনের পরিবেশ ভালো হওয়ার প্রধান মানদণ্ড হতে পারে। চারজনের মৃত্যু ‘কম’ বলে বিবেচিত হলেও প্রতিটি মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে। নির্বাচনী সহিংসতা কমানোর দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি এসব ঘটনার দায় ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সংবাদ সম্মেলনে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও কথা বলেন উপ প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার। তিনি জানান, সরকার ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পুলিশ বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। অভিযানে ঢালাও গ্রেপ্তারের পরিবর্তে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে বলেও জানান তিনি।

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকার একদিকে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে, অন্যদিকে অতীতের মতো নির্বিচার অভিযানের সমালোচনার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তুলনামূলক সতর্ক পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে তদন্ত ও বিচার কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এই অবস্থানের সত্যতা নির্ধারণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব আরও জানান, সম্প্রতি কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, আমদানি নীতি অধ্যাদেশসহ মোট ১১টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ও আইনি সংস্কারের প্রসঙ্গ একসঙ্গে তুলে ধরে সরকারের বক্তব্য মূলত একটি স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ের প্রাণহানি, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখায়, এই স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর। অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমানকে ভালো বলার প্রবণতা যতই থাকুক, বাস্তব মানদণ্ড হবে সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

তফশিলের পর চার হত্যাকান্ড, তবুও ‘ভালো পরিবেশ’ দাবি সরকারের

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৫:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনি তফশিল ঘোষণার পর চারজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ আগের সরকারের সময়ের তুলনায় ভালো বলে দাবি করেছে সরকার, যা একদিকে সহিংসতার বাস্তব চিত্রকে সামনে আনে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার একটি স্পষ্ট দূরত্বও তুলে ধরে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছেন। তিনি এসব ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বলেন, তারপরও নির্বাচনের পরিবেশ বিগত সরকারের আমলের চেয়ে ভালো।

তার বক্তব্যে অতীতের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি জানান, ২০১৪ সালের আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতায় অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভালো’ বলেই বিবেচনা করা যায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন তুলনামূলক সহিষ্ণুতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এই বক্তব্যের ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: প্রাণহানির সংখ্যা কম হওয়াই কি একটি নির্বাচনের পরিবেশ ভালো হওয়ার প্রধান মানদণ্ড হতে পারে। চারজনের মৃত্যু ‘কম’ বলে বিবেচিত হলেও প্রতিটি মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে। নির্বাচনী সহিংসতা কমানোর দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি এসব ঘটনার দায় ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সংবাদ সম্মেলনে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও কথা বলেন উপ প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার। তিনি জানান, সরকার ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পুলিশ বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। অভিযানে ঢালাও গ্রেপ্তারের পরিবর্তে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে বলেও জানান তিনি।

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকার একদিকে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে, অন্যদিকে অতীতের মতো নির্বিচার অভিযানের সমালোচনার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তুলনামূলক সতর্ক পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে তদন্ত ও বিচার কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এই অবস্থানের সত্যতা নির্ধারণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব আরও জানান, সম্প্রতি কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, আমদানি নীতি অধ্যাদেশসহ মোট ১১টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ও আইনি সংস্কারের প্রসঙ্গ একসঙ্গে তুলে ধরে সরকারের বক্তব্য মূলত একটি স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ের প্রাণহানি, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখায়, এই স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর। অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমানকে ভালো বলার প্রবণতা যতই থাকুক, বাস্তব মানদণ্ড হবে সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা।