ঢাকা ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডি. জে থেকে বিপ্লবী: হামী নেপালের গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:০৫:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / 83

হামী নেপালের প্রতিষ্ঠাতা সুদন গুরুং। ছবি : রয়টার্স

নেপালের পরিবর্তীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ‘মাস্টারমাইন্ড’ আসলে কে? এ প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর না থাকলেও একটি নাম ঘুরেফিরে বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। সুদন গুরুং। মাত্র ৩৬ বছর বয়সী এই যুবক কোন রাজনীতিবিদ কিংবা বড় কোন স্টার ছিলেন না। কিন্তু নেপালের নতুন প্রজন্ম; যারা কিনা জেন-জি হিসেবে পরিচিত তাদের ‘আইডল’। কিন্তু কেন?

 

সুদন গুরুং, পেশায় একজন ডি. জে। হামী নেপাল নামে তার একটি অপ্রসিদ্ধ অলাভজনক সংস্থা রয়েছে। যদিও এই সংস্থাটিও অনেক বেশি পরিচিত নয়। এই সংস্থাটি ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ২০২০ সালে নিবন্ধিত হয়।

 

গুরুং, যিনি হামী নেপাল প্রতিষ্ঠার আগে ডি.জে ছিলেন, ২০১৫ সালে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৯,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর এবং কোভিড-১৯ মহামারীর সময় নাগরিক সহায়তা কার্যক্রম সংগঠিত করেছিলেন।

 

হামী নেপালের প্রতিষ্ঠাতা সুদন গুরুং। ইতোমধ্যে তিনি নেপালের জনগনের আইডল হয়ে উঠেছেন। ছবি : রয়টার্স
হামী নেপালের প্রতিষ্ঠাতা সুদন গুরুং। ইতোমধ্যে তিনি নেপালের জনগনের আইডল হয়ে উঠেছেন। ছবি : রয়টার্স

 

সুদন গুরুং এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ২০২৫ সালের সেপ্টম্বরের সরকার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তাদের প্রচারনার প্রধান মাধ্যম ছিল ডিসকর্ড এবং ইনস্টাগ্রাম। ডিসকর্ড মূলত ভিডিও গেমারদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি মেসেজিং অ্যাপ, যেখানে ব্যবহারকারীরা চ্যাট, কল এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে পারে।

 

আন্দোলন দমাতে নেপালের পতিত সরকার গত ৪ সেপ্টেম্বর ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করলে, যুবসমাজে ক্ষোভ ছড়ায়। এই পরিস্থিতিতে সুদন গুরুং তার দলকে ব্যবহার করে কয়েক হাজার যুবককে ‘ডিসকর্ড’ গ্রুপে যুক্ত করে প্রতিবাদে অংশ নিতে প্রেরণা যোগায়।

 

হামী নেপালের সদস্যরা ভিপিএন ব্যবহার করে ‘নিষিদ্ধ’ প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে। তারা ডিসকর্ড এবং ইনস্টাগ্রাম- এ সতর্কভাবে বার্তা ছড়ায়, ভুল তথ্য বা “মিথ্যা খবর” চিহ্নিত করে এবং হাসপাতালের জরুরি নম্বর শেয়ার করে জনগণকে সহায়তা করে।

 

হামী নেপালের প্রাথমিক ‘ডিসকর্ড’ পোস্টগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারনে দেশটির জাতীয় টেলিভিশনেও তাদের বার্তাগুলো প্রচার করা হয়।

 

১৮ বছর বয়সী করণ কুলুং রাই জানান, “আমাকে প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি ‘ডিসকর্ড’ গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। আমরা পার্লামেন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম।”

 

এই আন্দোলন প্রাথমিকভাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। নেপালের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এটি স্থান করে নিয়েছে। প্রতিবাদের সময় কমপক্ষে ৭২ জন নিহত এবং ১,৩০০ এর বেশি আহত হয়।

 

প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে গুরুং বলেন, “আমি নিশ্চিত করব যে ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকবে এবং প্রতিটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিককে ন্যায়ের মুখোমুখি করা হবে।”

 

হামী নেপালের সদস্যরা, যারা অনলাইনে নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। জানিয়েছেন যে গুরুং এবং গ্রুপের অন্যান্য নেতারা এখন উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর কেন্দ্রে আছেন। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের নিয়োগও রয়েছে, যা মার্চ ৫ তারিখে নির্বাচনের আগে কার্যকর থাকবে। তারা ইতিমধ্যেই দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সেনা প্রধানকে রাজি করিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশিলা কারকিকে নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্বর্তী ক্ষমতায় নিয়োগ করার জন্য, গ্রুপের তিন জন সদস্য জানিয়েছেন।

 

হামী নেপালের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তারা বলছেন, “আমরা রাজনীতিবিদ হতে চাই না। সুদন গুরুং কেবল ‘জেনারেশন জেড’ গ্রুপকে সহায়তা করছেন এবং আমরা দেশের কণ্ঠস্বর।”

 

তাদের নেতৃত্বে, হামী নেপাল সরকারী কর্মকর্তাদের পরিবর্তন, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ তরুণদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য শুধুমাত্র দেশের জনগণকে শক্তিশালী এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাওয়া।

 

গ্রুপের ২৬ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক রোনেশ প্রধান বলেন, “আমরা রাজনীতিবিদ হতে চাই না। সুদন গুরুং কেবল ‘জেন জেড’ গ্রুপকে সহায়তা করছেন এবং আমরা কেবল দেশের কণ্ঠস্বর। নেতৃত্বের পদে আগ্রহ নেই।”

 

তথ্য সূত্র: রয়টার্স

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ডি. জে থেকে বিপ্লবী: হামী নেপালের গল্প

সর্বশেষ আপডেট ০১:০৫:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

নেপালের পরিবর্তীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ‘মাস্টারমাইন্ড’ আসলে কে? এ প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর না থাকলেও একটি নাম ঘুরেফিরে বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। সুদন গুরুং। মাত্র ৩৬ বছর বয়সী এই যুবক কোন রাজনীতিবিদ কিংবা বড় কোন স্টার ছিলেন না। কিন্তু নেপালের নতুন প্রজন্ম; যারা কিনা জেন-জি হিসেবে পরিচিত তাদের ‘আইডল’। কিন্তু কেন?

 

সুদন গুরুং, পেশায় একজন ডি. জে। হামী নেপাল নামে তার একটি অপ্রসিদ্ধ অলাভজনক সংস্থা রয়েছে। যদিও এই সংস্থাটিও অনেক বেশি পরিচিত নয়। এই সংস্থাটি ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ২০২০ সালে নিবন্ধিত হয়।

 

গুরুং, যিনি হামী নেপাল প্রতিষ্ঠার আগে ডি.জে ছিলেন, ২০১৫ সালে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৯,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর এবং কোভিড-১৯ মহামারীর সময় নাগরিক সহায়তা কার্যক্রম সংগঠিত করেছিলেন।

 

হামী নেপালের প্রতিষ্ঠাতা সুদন গুরুং। ইতোমধ্যে তিনি নেপালের জনগনের আইডল হয়ে উঠেছেন। ছবি : রয়টার্স
হামী নেপালের প্রতিষ্ঠাতা সুদন গুরুং। ইতোমধ্যে তিনি নেপালের জনগনের আইডল হয়ে উঠেছেন। ছবি : রয়টার্স

 

সুদন গুরুং এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ২০২৫ সালের সেপ্টম্বরের সরকার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তাদের প্রচারনার প্রধান মাধ্যম ছিল ডিসকর্ড এবং ইনস্টাগ্রাম। ডিসকর্ড মূলত ভিডিও গেমারদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি মেসেজিং অ্যাপ, যেখানে ব্যবহারকারীরা চ্যাট, কল এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে পারে।

 

আন্দোলন দমাতে নেপালের পতিত সরকার গত ৪ সেপ্টেম্বর ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করলে, যুবসমাজে ক্ষোভ ছড়ায়। এই পরিস্থিতিতে সুদন গুরুং তার দলকে ব্যবহার করে কয়েক হাজার যুবককে ‘ডিসকর্ড’ গ্রুপে যুক্ত করে প্রতিবাদে অংশ নিতে প্রেরণা যোগায়।

 

হামী নেপালের সদস্যরা ভিপিএন ব্যবহার করে ‘নিষিদ্ধ’ প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে। তারা ডিসকর্ড এবং ইনস্টাগ্রাম- এ সতর্কভাবে বার্তা ছড়ায়, ভুল তথ্য বা “মিথ্যা খবর” চিহ্নিত করে এবং হাসপাতালের জরুরি নম্বর শেয়ার করে জনগণকে সহায়তা করে।

 

হামী নেপালের প্রাথমিক ‘ডিসকর্ড’ পোস্টগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারনে দেশটির জাতীয় টেলিভিশনেও তাদের বার্তাগুলো প্রচার করা হয়।

 

১৮ বছর বয়সী করণ কুলুং রাই জানান, “আমাকে প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি ‘ডিসকর্ড’ গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। আমরা পার্লামেন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম।”

 

এই আন্দোলন প্রাথমিকভাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। নেপালের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এটি স্থান করে নিয়েছে। প্রতিবাদের সময় কমপক্ষে ৭২ জন নিহত এবং ১,৩০০ এর বেশি আহত হয়।

 

প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে গুরুং বলেন, “আমি নিশ্চিত করব যে ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকবে এবং প্রতিটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিককে ন্যায়ের মুখোমুখি করা হবে।”

 

হামী নেপালের সদস্যরা, যারা অনলাইনে নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। জানিয়েছেন যে গুরুং এবং গ্রুপের অন্যান্য নেতারা এখন উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর কেন্দ্রে আছেন। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের নিয়োগও রয়েছে, যা মার্চ ৫ তারিখে নির্বাচনের আগে কার্যকর থাকবে। তারা ইতিমধ্যেই দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সেনা প্রধানকে রাজি করিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশিলা কারকিকে নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্বর্তী ক্ষমতায় নিয়োগ করার জন্য, গ্রুপের তিন জন সদস্য জানিয়েছেন।

 

হামী নেপালের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তারা বলছেন, “আমরা রাজনীতিবিদ হতে চাই না। সুদন গুরুং কেবল ‘জেনারেশন জেড’ গ্রুপকে সহায়তা করছেন এবং আমরা দেশের কণ্ঠস্বর।”

 

তাদের নেতৃত্বে, হামী নেপাল সরকারী কর্মকর্তাদের পরিবর্তন, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ তরুণদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য শুধুমাত্র দেশের জনগণকে শক্তিশালী এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাওয়া।

 

গ্রুপের ২৬ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক রোনেশ প্রধান বলেন, “আমরা রাজনীতিবিদ হতে চাই না। সুদন গুরুং কেবল ‘জেন জেড’ গ্রুপকে সহায়তা করছেন এবং আমরা কেবল দেশের কণ্ঠস্বর। নেতৃত্বের পদে আগ্রহ নেই।”

 

তথ্য সূত্র: রয়টার্স