ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় শুধু একটি দল: ব্যাখ্যা দিল প্রেস উইং
- সর্বশেষ আপডেট ১০:১৫:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ জুন ২০২৫
- / 214
দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছরের জুনের মধ্যে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু জাপান সফরে গিয়ে শুধু একটি রাজনৈতিক দল সেই পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ডিসেম্বরে নির্বাচন চাইছে বলে দাবি করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। আজ (০১ জুন) রোববার প্রেস উইং তাঁর সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
আজ বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। ডিসেম্বরে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন চায়—এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপ্রেস সচিব বলেন, ‘বড় দলগুলোর মধ্যে একটি দল ডিসেম্বরে নির্বাচন চায়, সেটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাপানের রাজধানী টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে ৩০তম নিক্কেই ফোরামে ‘ফিউচার অব এশিয়া’র উদ্বোধনী অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রথমটি হলো সংস্কার, দ্বিতীয়টি অপরাধীদের বিচার (বিশেষ করে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের), এবং তৃতীয়টি হলো নির্বাচন। তিনি বলেন, নির্বাচন এ বছরের শেষ ডিসেম্বরে অথবা সর্বোচ্চ আগামী বছরের জুনে অনুষ্ঠিত হবে। সংস্কার কতটা সম্পন্ন হচ্ছে, তার ওপর নির্বাচন নির্ভর করবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে আগের অবস্থায়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে চাই, তাহলে ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা বলা যেতে পারে। আমরা যদি খুব তাড়াহুড়ো করে কিছু সংস্কার করি এবং বাকি সংস্কারের জন্য অপেক্ষা করতে পারি, তাহলে নির্বাচন ডিসেম্বরে হতে পারে। তবে যদি আমরা গভীর ও স্থায়ী সংস্কার চাই, তাহলে আমাদের আরও ছয় মাস সময় নিতে হবে।’
কিন্তু কিছু ব্যক্তি সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ না করেই নির্বাচন করতে বলছেন—এ কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, সব রাজনৈতিক দল নয়, শুধু একটি দল এ দাবি করছে। তিনি আরও বলেন, তাঁর কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। তিনি একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফর ‘খুবই সফল’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে ছয়টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করে শফিকুল আলম জানান, অর্থনৈতিক সংস্কার ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার জন্য উন্নয়ননীতি ঋণ হিসেবে ৪১৮ মিলিয়ন ডলার, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদীকে ডুয়েল গেজ ডাবল রেলপথে উন্নয়নে ৬৪১ মিলিয়ন ডলার এবং বৃত্তির জন্য অনুদান হিসেবে আরও ৪.২ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে জাপান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা যেসব আশ্বাস চাচ্ছিলাম, তার প্রতিটিই পেয়েছি। তাঁরা বলেছেন, জাপান এই অন্তর্বর্তী সরকারের পাশে থাকবে এবং মহেশখালী ও মাতারবাড়ী ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বিষয়ে মাস্টারপ্ল্যানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’
সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বারবার বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর স্বপ্ন। সে জন্য প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাপানিরা এখন “চায়না প্লাস ওয়ান” নীতি অনুসরণ করছে। আগে বিনিয়োগ ছিল চীনমুখী, এখন তারা নতুন বাজার খুঁজছে। ড. ইউনূস জাপানের প্রধান বিনিয়োগ সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করেছেন এবং বিনিয়োগকারীদের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। চীন সফরের পর যেভাবে চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসেছিলেন, আশা করা হচ্ছে জাপান সফরের পর সেখান থেকেও বিনিয়োগকারীরা আসবেন।’
জাপানের জনশক্তি বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘এ বিষয়ে কিছু চুক্তি হয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে সেখানে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার বাংলাদেশি আছেন। এই সরকারের সময় রেকর্ডসংখ্যক তিন হাজার শিক্ষার্থী জাপানে গেছেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থী পাঠানো হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, ‘ভাষার ক্ষেত্রে জাপান ছাড় দিচ্ছে। আমরা আশা করছি, সামনে আরও আলোচনা হবে। যত দ্রুত ও যত বেশি জনশক্তি পাঠানো যায়, সে চেষ্টা করছেন প্রধান উপদেষ্টা।’
জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, নেপাল, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো কীভাবে এত জনশক্তি পাঠাতে পেরেছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখব। দ্রুত স্কেল-আপ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং টাস্কফোর্স কাজ শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে জাপানে থাকা বাংলাদেশিরাও আমাদের সহায়তা করবেন।’
গুমসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, ‘গুম কমিশনের সদস্যরা দিনরাত কাজ করছেন। দুটি প্রতিবেদন ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, আরও একটি আসবে। তাতে বিস্তারিত জানা যাবে। আপনারা গুম কমিশনের কাজ ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করুন। যাঁরা গুমের শিকার হয়েছেন, তাঁরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। এখনো অনেকেই নিখোঁজ। তাঁরা কোথায় আছেন, কী ঘটেছে—তা জাতি জানতে চায়। কমিশন তাদের কাজ শেষ করুক, এরপর আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
































